শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা-উপকরণ ব্যবহার এবং সফল পাঠদান

image_pdfimage_print

প্রত্যেক পেশাজীবীকেই তার নিজস্ব পেশায় সফলতা অর্জনের জন্য পেশাগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেয়ার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা লাভ করতে হয় কিন্তু কেবল এ দুটির মাধ্যমেই তার পক্ষে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব নয়।

কোন কোন পেশা আছে (চিকিৎসা বিদ্যা, প্রকৌশল বিদ্যা ইত্যাদি) যেগুলোতে সফল হতে হলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে ঐ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বহুল ব্যবহৃত উপকরণ এবং সহায়ক সামগ্রীর ব্যবহারেও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। বাস্তবিক পক্ষে এসব উপকরণের সঠিক ব্যবহারের কলাকৌশল আয়ত্ত্ব করা এ সকল পেশার জন্য নির্ধারিত প্রশিক্ষণ এবং ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা লাভের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।

একজন শল্যচিকিৎসক যত দক্ষ ও অভিজ্ঞ হন না কেন, তিনি তার পেশায় অর্থাৎ অস্ত্রোপচার কাজে কখনই সফল হতে পারবেন না যদি তাকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম সরবরাহ করা না হয়। এরূপ একজন সৈনিককে সমরাস্ত্র সরবরাহ করা না হলে তার পক্ষে যুদ্ধেক্ষত্রে যুদ্ধ করে সাফল্য লাভ করা অসম্ভব। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষকের কাছে পাঠ সহায়ক কোন উপকরণ যদি না থাকে তবে তিনিও নিরস্ত্র সৈনিকের মত শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীকে অনেক ক্ষেত্রে যথার্য সাহায্য ও সহযোগিতা দিতে পারবেন না।

শিক্ষার বিষয়বস্তুকে শিক্ষার্থীর কাছে আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক করতে হলে শিক্ষকের হাতে পাঠসহায়ক কিছু উপকরণ থাকা আবশ্যক। পাঠ সহায়ক উপকরণের সহায়তায় বেশ জটিল বিষয়কেও সহজে শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট ও বোধগম্য করে তোলা যায়।
একজন পেশাজীবী হিসেবে সফল হতে হলে শিক্ষকের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অঙ্গ হিসেবে শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষা সহায়ক সামগ্রী সংগ্রহ, তৈরি, ব্যবহারে নৈপুণ্য লাভের সুযোগ থাকতে হবে।

শিক্ষা উপকরণ কী :
শিখন- শেখানো অর্থাৎ শিক্ষা দেয়া ও নেয়ার কাজে যে সমস্ত বস্তু বা সামগ্রী অবদান রাখতে পারে সেগুলোকে শিক্ষা উপকরণ বা শিক্ষা সামগ্রী বলা হয়। শিক্ষা উপকরণের সবচেয়ে পরিচিত ও উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হচ্ছে পাঠ্যপুস্তক, সহায়ক পুস্তক ইত্যাদি। এছাড়াও শিক্ষা উপকরণের মধ্যে রয়েছে শ্রেণীকক্ষে সাধারণভাবে ব্যবহৃত দ্রব্যাদি যেমন- ব্লাকবোর্ড, চক, মার্কার কলম, ফ্লানেল বোর্ড ইত্যাদি। এই দুই শ্রেণীর উপকরণকে আমরা সাধারণ শিক্ষা উপকরণ বলতে পারি। এগুলো ছাড়া যে সমস্ত উপকরণ পাঠগ্রহণ ও পাঠদানে বিশেষ অবদান রাখতে পারে অর্থাৎ যে সমস্ত উপকরণ পাঠগ্রহণ ও পাঠদানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাজকে বিশেষভাবে সহায়তা করে বলে এগুলোকে বিশেষ ধরনের শিক্ষা উপকরণ বলা যায়। এগুলোকে সাধারণত ‘শিক্ষা সহায়ক উপকরণ’ নামে অভিহিত করা হয়। যে সমস্ত উপকরণের সাহায্যে পাঠ্য বিষয়কে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করে তোলা যায়, তাকে পাঠ সহায়ক উপকরণ বলে। অর্থাৎ শিখন-শেখানোর কাজ আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করার জন্য যে সমস্ত উপকরণ ব্যবহৃত হয়, এককথায় শিখন- শেখানোর কাজে বিশেষভাবে সহায়ক হয়, এরকম উপকরণকে শিক্ষা সহায়ক উপকরণ বলে।

শিক্ষা উপকরণের প্রকারভেদ :
শিক্ষা সহায়ক উপকরণের মধ্যে শ্রবণ ও দর্শনমূলক উপকরণাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শ্রবণ দর্শন সহায়ক উপকরণ বলতে এমন ধরনের পাঠ সহায়ক উপকরণসমূহকে বোঝায়, যার কোনটি দর্শনযোগ্য, কোনটি শ্রবণযোগ্য এবং কোনটি একই সাথে দর্শন ও শ্রবণযোগ্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ সহায়ক উপকরণকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা চলে। যথা-
১. দৃশ্য উপকরণ: যেমন, পোষ্টার পেপার, ভিপ কার্ড, গাছ পালার অংশ বিশেষ, ফল ফুল ইত্যাদি।

২. শ্রব্য উপকরণ : যেমন, রেডিও, টেপরেকর্ডার, গ্রামোফোন, ল্যাংগুয়েজ ল্যাব ইত্যাদি
৩. দৃশ্য-শ্রব্য উপকরণ : যেমন, টেলিভিশন, সিনেমা, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ইত্যাদি।

শিক্ষাপোকরণ উদ্ভাবন :
শ্রেণীকক্ষে পঠন-পাঠন আকর্ষণীয়, গ্রহণযোগ্য ও ফলপ্রসূ করতে হলে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী। শিক্ষার্থীদের সামনে কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয়গুলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপকরণের সহায়তায় উপস্থাপন করতে পারলে তারা অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারে এবং দীর্ঘকাল তা শিক্ষার্থীর মনে টিকে থাকে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে, দাখিল মাদরাসার নবপ্রবর্তিত শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাতে পাঁচটি শ্রেণীতে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে এবং প্রত্যেকটি বিষয়ে অনেকগুলো করে স্বতন্ত্র পাঠ সন্নিবেশিত করা হয়েছে। প্রত্যেকটি পাঠের জন্য একাধিক শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করা প্রয়োজন। এ সকল উপকরণ ক্রয়ের জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হয়। এজন্য ব্যয়বহুল কোন উপকরণ ব্যবহারের কথা চিন্তা না করাই ভালো। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের/দাখিল মাদরাসার সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ের জন্য যে সমস্ত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্যাদি একান্ত প্রয়োজন সেগুলো সরবরাহ করার সামর্থ্যই অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেই। এমতাবস্থায় পাঠ সহায়ক শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা অধিকাংশ বিদ্যালয়ের পক্ষেই সম্ভব নয়। দৃশ্যশ্রব্য উপকরণের মধ্যে শিক্ষামূলক ফিল্ম, টেলিভিশন, ভি সি আর ইত্যাদি ক্রয় করার সামর্থ্য অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরই নেই। শ্রব্য উপকরণের মধ্যে রেডিও, টেপরেকর্ডার গ্রামোফোন ইত্যাদি ক্রয় করার ক্ষমতা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের থাকলেও শ্রেণীকক্ষে ব্যবহারে বেশকিছু অন্তরায় রয়েছে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে, দাখিল মাদরাসায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি, অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে, মাদরাসায় দুই শ্রেণীর মাঝখানে কোন দেয়াল নেই। সুতরাং কোন শ্রেণীতে রেডিও, টেপরেকর্ডার ব্যবহার করলে অন্য শ্রেণীতে পাঠদান বিশেষভাবে বিঘিœত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমতাবস্থায় শুধুমাত্র দর্শনযোগ্য শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করার সুযোগই আমাদের মাধ্যমিক বিদ্যালগুলোতে রয়েছে। এই দৃশ্য শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ ও ব্যবহার ব্যায়সাপেক্ষ। প্রত্যেক শিক্ষকেরই কমবেশি দৈনিক ৫/৬ টি ক্লাস নিতে হয়। প্রত্যেকটি ক্লাসে একটি করে উপকরণ ব্যবহার হলেও দৈনিক বেশ কয়েকটি উপকরণ প্রয়োজন।
এ সকল সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ সহায়ক উপকরণ ব্যবহারে শিক্ষকগণকে উৎসাহিত করতে হলে এমন ধরনের উপকরণ উদ্ভাবন করা আবশ্যক যাতে ব্যয় অত্যন্ত কম, সংগ্রহ করা খুবই সহজসাধ্য, তৈরী করা কম পরিশ্রম সাপেক্ষ এবং ব্যবহার করাও কম আয়াসসাধ্য।

শিক্ষা উপকরণ তৈরি :
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের/দাখিল মাদরাসায় উচ্চ শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষাদানে কিছু ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া মাতৃভাষা, ইংরেজি, আরবি, ফিকহ্, আকাইদ, গণিত, সমাজপাঠ, ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ের জন্য পাঠ সহায়ক উপকরণ তৈরি করা একজন অভিজ্ঞ শিক্ষকের পক্ষে মোটেই কঠিন কাজ নয়, কিছু সময় ও পরিশ্রমের প্রয়োজন মাত্র। এছাড়া যে কোন বিষয়ের জন্য একবার উপকরণ সংগ্রহ ও তৈরি করতে পারলে তা বহুদিন যাবৎ বিভিন্ন পাঠে ব্যবহার করা সম্ভব। এজন্য পরিবেশ থেকে পাঠ সহায়ক শিক্ষোপকরণের প্রয়োজনে কিছু বাস্তব জিনিসপত্র সংগ্রহ করা যেতে পারে। এছাড়া মাধ্যমিক/দাখিল স্তরের পাঠ্যসূচীর জন্য সহজলভ্য জিনিসপত্র দিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছু শিক্ষা উপকরণ তৈরি করাও কঠিন কাজ নয়। পাঠদানের জন্য সহজভাবে তৈরি বা সংগ্রহীত শিক্ষা উপকরণ বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। যথা-

ক. বাস্তব জিনিস :
বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে, মাঠে, পুকুরে, বাগানে, নিকটস্থ হাটবাজারে এমন কিছু জিনিসপত্র অহরহই পাওযা যায়, যা শিক্ষক নিজে কিংবা শিক্ষার্থীদের দিয়ে সংগ্রহ করে শ্রেণীকক্ষে ব্যবহার করে সমাজ পাঠ, সাধারণ বিজ্ঞান ভূগোল, ফিকহ, আরবি ভাষা, কৃষিবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ের পাঠদানকে বাস্তবভিত্তিক, আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করে তুলতে পারেন।
খ. মডেল : অনেক সময় তাৎক্ষণিভাবে কোন জিনিসের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দেয়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে বাস্তব জিনিসের মডেল তৈরি করে তা শ্রেণীতে প্রদর্শন করা যেতে পারে। শহীদ মিনার, তাজমহল, পিরামিড, সৌরজগৎ, মানুষের দেহের অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মডেল তৈরি করে দেখালে শিক্ষার্থীরা বাস্তবের কাছাকাছি অভিজ্ঞতা অর্জন করে সহজেই পাঠ্যবিষয় অনুধাবন করতে পারবে এবং প্রচুর আনন্দও পায়।
গ. চার্ট :
এমন অনেক বিষয় আছে যা বক্তৃতার সাহায্যে বোঝানো অপেক্ষা চার্টের মাধ্যমে বোঝানো সহজ হয় এবং তাতে শিক্ষার্থীদের মনে রাখাও সুবিধা হয়। শিক্ষাদান কাজে ব্যবহৃত চার্টের ৪টি প্রকার লক্ষ্য করা যায়।
ক্স বৃক্ষচার্ট (ঞৎবব ঈযধৎঃ) : এর দ্বারা কোন বিষয়ের বৃদ্ধি বা পরিণতি দেখানো যায়। এতে মূল বিষয় হতে বিভিন্ন বিষয় কিভাবে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ছড়িয়ে আছে তা দেখানো সম্ভব হয়।
ক্স প্রবাহ চার্ট : (ঋষড়ি ঈযধৎঃ) এটি বৃক্ষচার্টের প্রায় অনুরূপ তবে মূল জিনিস হতে অন্যান্য জিনিসগুলো কিভাবে গঠিত হয়েছে তা তীর চি‎হ্ন দিয়ে দেখানো হয়।
ক্স পরিসংখ্যান চার্ট : এতে কোন বিষয়ের উপর সংগ্রহীত পরিসংখ্যানগুলোকে কোন প্রতীক বা ছবির সাহায্যে অর্থবোধক করা হয়।
বৃত্তাকৃতি চার্ট : এতে একটি বৃত্তের মধ্যে সমগ্র বিষয়ের গুরুত্বের উপর ভিত্তি করে জিনিসগুলো ছোট বড় হয়।
ঘ. ছবি
যেখানে কিছুই নেই, সেখানে ছবি আছে। যেকোন জিনিসের ছবি হতে পারে। শিক্ষাদান ক্ষেত্রে ছবি একটি গুরুত্বপূণ হাতিয়ার। ছবি বলতে ক্যামেরায় তোলা ফটোগ্রাফও হতে পারে, আবার শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবিও হতে পারে। ছবি আঁকতে না পারলে বিভিন্ন ক্যালে-ার, পুরানো পত্র পত্রিকা, পোষ্টার ইত্যাদি থেকে প্রয়োজনীয় ছবি কেটে সংগ্রহ করে শ্রেণীতে প্রদর্শন করা যেতে পারে। কোন কোন ছবির টেমপ্লেট কেটেও শিক্ষক-শিক্ষিকা সময়মত বোর্ডে এঁকে দিতে পারেন।
ঙ. নকশা :
নকশার ছবির মতো জিনিসটির পূর্ণ হুবহু রূপ না দেখিয়ে কেবলমাত্র আকার-আকৃতিতেই দেখানো হয়। জ্যামিতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সঠিকভাবে অঙ্কন করে দেখানো দরকার। কোন প্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়োজন হলে নকশায় রঙিন চক বা পেন্সিল ব্যবহার করা যেতে পারে।
চ. মানচিত্র :
ভূগোল, ইতিহাস, সমাজপাঠ, মাতৃভাষা ইত্যাদি বিষয়ক পাঠদানে মানচিত্রের ব্যবহার অত্যন্ত জরুরী। শিক্ষক শিক্ষিকা খালি হাতে মানচিত্র আঁকতে পারেন না। এজন্য তিনি পূর্বা‎ে‎হ্নর বিভিন্ন জায়গায় মানচিত্র যোগাড় করে শক্ত কাগজের উপর কেটে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তা বোর্ডে এঁটে বোঝাতে পারেন।
ছ. গ্লোব :
পৃথিবীর নক্সা হিসেবে মানচিত্রের প্রয়োগ থাকলেও পৃথিবীর আকৃতি, বিভিন্ন স্থানের মধ্যে দূরত্ব ইত্যাদি মানচিত্রে ধারণ করা সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে কঠিন হয় বলে পৃথিবীর প্রতিকৃতি হিসেবে গ্লোব প্রস্তুত করা হয়। শিক্ষক-শিক্ষিকা ইচ্ছা করলে পুরানো কাগজপত্র দিয়ে ম- তৈরি করে পৃথিবীর গোলাকৃতি রূপ দিতে পারেন এবং পরে ট্রেসিং পেপার বাজারে কেনা গ্লোবের উপররে নক্সা এঁকে গোলাকৃতির উপর স্থাপন করে অতি সহজেই নিজে গ্লোব তৈরি করতে পারেন।
যে কোন বিষয় শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষা উপকরণের যথাযথ ব্যবহার যেমন আবশ্যক তেমনি শিক্ষা উপকরণ তৈরি করতে চারু ও কারুকলা শিক্ষায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী। চারু ও কারুকলা হাতে কলমে শিক্ষা উপকরণ তৈরি করার কৌশল অর্জনে শিক্ষককে বিশেষ সাহায্য করে থাকে। শিক্ষক/শিক্ষিকা যখন ক্লাসে পড়াতে যাবেন তখন যদি ব্ল্যাক বোর্ডে কিছুই অংকন না করতে পারেন কিম্বা অন্য কোন উপকরণের সাহায্য না নেন তাঁকে কোনোক্রমেই একজন ভালো শিক্ষক/শিক্ষিকা বলে অভিহিত করা যাবে না। সুতরাং কার্যকরী শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষক/শিক্ষিকার পক্ষে চারু ও কারুকলার সবিশেষ গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই।

শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার :
শিক্ষা উপকরণ তৈরি করার পর তার ব্যবহার-উপযোগিতা যাচাই করা আবশ্যক। শিক্ষক বা শিক্ষিকার পাঠদানে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণে শিক্ষা উপকরণ কি পরিমাণ সাহায্য করতে সক্ষম তা পরখ করে দেখার পরই মন্তব্য করা যাবে যে, শিক্ষা উপকরণ শিক্ষোপযোগী হয়েছে কিনা। শিক্ষোপকরণের সুবিবেচনাপ্রসুত ব্যবহারই শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও শিক্ষণীয় বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় ও উপাদেয় করতে পারে। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারে উদ্ধুদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য এর পরিকল্পনা প্রয়োগ ও পরখ করে উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করতে তৎপর হতে পারে না। শিক্ষা উপকরণ যথাযথভাবে ব্যবহারে নিম্নিলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি দেয়া উচিত-
ক. শিক্ষা উপকরণ বাছাই : শিক্ষার্থীর বয়স, গ্রহণ ক্ষমতা, আগ্রহ ইত্যাদির প্রতি খেয়াল রেখে কি ধরণের শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার যথোপযুক্ত হবে তা নির্বাচন করা বা বাছাই করা আবশ্যক।
খ. শিক্ষকের পূর্ব প্রস্তুতি : শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করার পূর্বেই তার পূর্ণ ব্যবহারের কলাকৌশল আয়ত্ত করবেন, যাতে ক্লাসে গিয়ে কোন সমস্যা বা অসুবিধার সম্মুখীন না হন।
গ. উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা : শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের কারণ বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিজে অবহিত থাকবেন এবং শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের ফলে সেই উদ্দেশ্য কতটকু সফল হয়েছে তাও সচেতনতার সাথে লক্ষ্য করবেন।

শিক্ষা উপকরণ তৈরি, পরিকল্পনা ও ডিজাইন :
স্থানীয়বাবে যা কিছু কাঁচামাল পাওয়া যায়, তা দিয়ে যথাসম্ভব ভালোভাবে পরিকল্পনা করেই শিক্ষা উপকরণ প্রস্তুত করা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে যে, এটি যেন বাস্তবে রূপ দেয়া যায় এবং তৈরি জিনিস শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ব্যবহারের উপযোগী হয়। অবস্থার প্রেক্ষিতে একে কিভাবে আরো উন্নত, আরো উপযোগী করা যায় তার ব্যবস্থা রাখা আবশ্যক। এছাড়া উপকরণ তৈরিতে নিম্নলিখিত বিষয়ের প্রতি নজর দেয়া উচিত-
ক.কোন স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য উপকরণ তৈরি বা ডিজাইন করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বয়স, পূর্বজ্ঞান পারিপার্শ্বিক অবস্থা, শিক্ষা গ্রহণের উচ্ছা, ক্ষমতা ইত্যাদির প্রতি খেয়াল রেখে শিক্ষা উপকরণ তৈরির পরিকল্পনা কর া আবশ্যক।
খ. বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিবেচনা করে নির্দিষ্ট পাঠের জন্য তৈরি উপকরণ আদৌ পাঠসহায়ক উপকরণ হবে কি না।
গ. যে উপকরণটি তৈরি করা হবে তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের কতটুকু উপকার হবে।
ঘ. কোন্ পন্থা অবলম্বন করলে উপকরণটির দ্বারা শিক্ষার্থীর মনে পাঠের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
ঙ. প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠদানে এটি ব্যবহার করা যাবে কি না।
চ. উপকরণের কাঁচামাল, স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য কিনা, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে পাওয়া সম্ভব কি না।
ছ. শিক্ষক একটি উপকরণটি তৈরি করতে পারবেন, নাকি ছাত্র, অভিভাবক কিংবা অন্য কোন বিশেষজ্ঞ কারিগরের সাহায্য প্রয়োজন হবে।
জ. সাধারণ হাতযন্ত্র কিংবা স্বল্পমূল্যের যন্ত্রপাতির সাহায্যে কম সময়ে তৈরি করা সম্ভব কিনা।
ঝ. উপকরণটি কতদিন পর্যন্ত ব্যবহারের যোগ্য থাকবে, কিভাবে প্রস্তুত করলে তার স্থায়িত্ব আরো বাড়ানো সম্ভব।
ঞ. শিক্ষোপকরণটির কাঠামো শ্রেণীতে ব্যবহার-উপযোগী কিনা।

উপস্থাপন :
উপকরণগুলো শিক্ষকের হাতের কাছে মওজুদ থাকবে এবং কোন উপকরণ কোন সময় প্রদর্শন করা আবাশ্যক সে সম্পর্কেও তিনি পূর্ব পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। উপকরণটি ব্যবহার শেষে তা শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের সামনে থাকলে পাঠদানের পরবর্তী বিষয়বস্তুতে মনোসংযোগ বিঘিœত হবার সম্ভাবনা থাকে।

শিক্ষাপোকরণ সংরক্ষণ :
শিক্ষা উপকরণ যদিও আলমারিতে সাজিয়ে রাখার উদ্দেশ্য তৈরি করা হয় না, তবুও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে এগুলো নষ্ট হতে পারে, হারিয়ে যেতে পারে। এজন্য শিক্ষককে সাধারণ মেরামতের কাজটুকু নিজেকেই জানতে হবে, করতে হবে। শিক্ষা উপকরণ যথার্থভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে বছরের পর বছর তা ব্যবহার করা সম্ভব। উপকরণ সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষক/শিক্ষিকা নিজের গরজে সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করবেন।

উপসংহার :
শিক্ষা উপকরণ সম্পর্কে উপরে যা কিছু আলোচনা করা হলো তা একটা ধারণা মাত্র। শিক্ষা উপরকণ সময় ও বাস্তবতার আলোকে পরিবর্তনশীল। শহর ও গ্রামভেদে এর ভিন্নতা হবে এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষককেই সময় ও বাস্তবতা বুঝে শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শেণীর সকল শিক্ষার্থীদের শিখনফল অর্জন করার জন্য বস্তবমূখী পদক্ষেপ গ্রহণই শিক্ষকের মূল কাজ।

ড. মোহাম্মদ নূরুল্লাহ
প্রশিক্ষক, বিএমটিটিআই, গাজীপুর

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Please wait...

Subscribe to our Site

Want to be notified when our article is published? Enter your email address and name below to be the first to know.