সুরায়ে আয়াতুল কুরসির ফজিলত কি ?

পবিত্র কোরআনে বিশেষ বিশেষ কিছু আয়াত ও সুরা রয়েছে, যা খুবই ফজিলতপূর্ণ। তন্মধ্যে আয়াতুল কুরসি অন্যতম।

আয়াতুল কুরসির ফজিলত সম্পর্কে আসুন জেনে নিই, কী বলেছেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.)।

ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেন, একদিন উবাই ইবনে কা’বকে নবী (সা.) জিজ্ঞেস করেন, কোরআনের মধ্যে কোন আয়াতটি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ? তিনি বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই তা বেশি জানেন। হুজুর (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আয়াতুল কুরসি। অতঃপর হুজুর (সা.) বলেন, হে আবুল মানজার! তোমাকে এই উত্তম জ্ঞানের জন্য ধন্যবাদ। সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার আত্মা। এর একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট রয়েছে, যা দিয়ে সে আরশের অধিকারীর পবিত্রতা বর্ণনা করে।

আয়াতুল কুরসির ফজিলত সম্পর্কে উবাই ইবনে কা’ব (রহ.)-এর পিতা তাঁকে বলেন : আমার খেজুর ভর্তি একটি বস্তা ছিল এবং প্রতিদিন সেটা আমি পরিদর্শন করতাম। কিন্তু একদিন কিছুটা খালি দেখে রাত জেগে পাহারা দিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম, যুবক ধরনের কে একজন এলো! আমি তাকে সালাম দিলাম; সে সালামের উত্তর দিল।

অতঃপর জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি জিন না ইনসান? সে বলল, আমি জিন। আমি বললাম, তোমার হাতটা বাড়াও তো। সে বাড়ালে আমি তার হাতে হাত বুলাই। হাতটা কুকুরের হাতের গঠনের মতো এবং কুকুরের লোমও রয়েছে। আমি বললাম, সব জিন কি এ ধরনের? সে বলল, সব জিনের মধ্যে আমিই সর্বাপেক্ষা বেশি শক্তিশালী। এরপর আমি তাকে বললাম, যে উদ্দেশ্যে তুমি এসেছ, তা তুমি কিভাবে সাহস পেলে? সে উত্তরে বলল, আমি জানি যে আপনি দানপ্রিয়। তাই ভাবলাম, সবাই যখন আপনার নিয়ামতের দ্বারা উপকৃত হচ্ছে, তাহলে আমি কেন বঞ্চিত হব? অবশেষে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের অনিষ্ট হতে কোন জিনিস রক্ষা করতে পারে? সে বলল, তা হলো ‘আয়াতুল কুরসি’।

সকালে উঠে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে রাতের ঘটনাটি বললে হুজুর (সা.) বলেন, দুষ্ট তো ঠিক বলেছে।

ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেন, আবু সালিল (রহ.) বলেন : নবী (সা.)-এর কোনো এক সাহাবির সঙ্গে লোকজন কথা বলতেছিল। কথা বলতে বলতে তিনি ঘরের ছাদের ওপর ওঠেন। তখন তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার জিজ্ঞেস করেন যে বলতে পারো, কোরআন শরিফের কোন আয়াতটি সবচেয়ে বড়? তখন জনৈক সাহাবি বলেন, আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল… এই আয়াতটি সবচেয়ে বড়। অতঃপর সেই লোকটি বলল, আমি এই উত্তর দেওয়ার পর হুজুর (সা.) আমার কাঁধের ওপর হাত রাখেন এবং আমি এর শীতলতা বুক পর্যন্ত অনুভব করছিলাম। অথবা তিনি বুকে হাত রেখেছিলেন এবং আমি এর শীতলতা কাঁধ পর্যন্ত অনুভব করছিলাম। অতঃপর হুজুর (সা.) বলেন, হে আবু মানজার! তোমাকে এই উত্তম জ্ঞানের জন্য ধন্যবাদ।

ইমাম আহমাদ (রহ.) বর্ণনা করেন, সালমা ইবনে ওয়ার্দান বলেন, তাঁকে আনাস ইবনে মালিক (রহ.) বলেছেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো এক সাহাবিকে বললেন, তুমি কি বিয়ে করেছ? সাহাবি বললেন, না, আমার কাছে ধন-সম্পদ কিছুই নেই। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, তোমার কাছে কি ‘কুল হু আল্লাহু আহাদ’ নেই? তিনি বললেন, জি, আছে। রাসুল (সা.) বলেন, এটা হলো কোরআনের এক-চতুর্থাংশ। এরপর বলেন, তোমার কাছে কি ‘কুল ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন’ নেই? তিনি বললেন, জি, আছে। রাসুল (সা.) বলেন, এটা হলো কোরআনের এক-চতুর্থাংশ। রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে কি ‘ইজা জুলজিলাত’ নেই? সাহাবি বললেন, জি, আছে। তিনি বললেন, এটা হলো কোরআন শরিফের এক-চতুর্থাংশ। রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে কি ‘ইজা জায়া নাসরুল্লাহি’ নেই? সাহাবি বললেন, জি, আছে। হুজুর (সা.) বলেন, এটা হলো কোরআনের এক-চতুর্থাংশ। এরপর রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করেন, তোমার কাছে কি ‘আয়াতুল কুরসি’ নেই? সাহাবি বললেন, জি, আছে। রাসুল (সা.) বললেন, এটাও কোরআনের এক-চতুর্থাংশ।

আবু যর জুনদুব ইবনে জানাদাহ (রা.) বলেন, একদিন আমি নবী (সা.)-এর কাছে এলে তাঁকে মসজিদে বসা দেখি এবং আমিও গিয়ে তাঁর কাছে বসি। এরপর নবী (সা.) বলেন, হে আবু যর! নামাজ পড়েছ? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, ওঠো, নামাজ পড়ো। আমি উঠে নামাজ পড়ে আবারও গিয়ে বসলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে তখন বলেন, মানুষ শয়তান থেকে এবং জিন শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! মানুষও শয়তান হয় নাকি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! নামাজ সম্বন্ধে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, এটা একটি উত্তম বিষয়। তবে যার ইচ্ছা বেশি অংশ নিতে পারে এবং যার ইচ্ছা কম অংশ নিতে পারে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আর রোজা? তিনি বললেন, এটি একটি উত্তম ফরজ এবং তা আল্লাহর কাছে অতিরিক্ত হিসেবে জমা থাকবে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সাদকা? তিনি বললেন, এটা বহুগুণ বিনিময় আদায়কারী। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কোন দান সবচেয়ে উত্তম? তিনি বললেন, অল্প সংগতি থাকতে বেশি দেয়ার সাহস করা এবং দুস্থ মানুষকে গোপনে সাহায্য-সহযোগিতা করা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! সর্বপ্রথম নবী কে? তিনি বললেন, হজরত আদম (আ.)। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! তিনি কি নবী ছিলেন? রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ, তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকারী নবী ছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুল কতজন ছিলেন? তিনি বললেন, তাঁরা হলেন ৩১০-এরও কিছু বেশি। তবে অন্য সময় রাসুল (সা.) বলেছিলেন, তাঁরা ছিলেন ৩১৫ জন। এরপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার প্রতি সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কোন আয়াতটি নাজিল হয়েছে? রাসুল (সা.) বললেন, ‘আয়াতুল কুরসি। ‘ (নাসায়ি)

আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) হতে ধারাক্রমে ইমাম আহমদ (রহ.) বর্ণনা করেন, আবু আইয়ুব আনসারি (রহ.) বলেন : আমার একটি খাদ্যভাণ্ডার ছিল এবং তা থেকে জিন খাদ্য চুরি করে নিয়ে যেত। আমি এটা টের পেয়ে হুজুর (সা.)-এর কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করি। হুজুর (সা.) আমাকে শিখিয়ে দেন, তুমি যখন তাকে আসতে দেখবে, তখন পড়বে : ‘বিসমিল্লাহি আজিবি রাসুলুল্লাহি’। এরপর জিন এলে আমি তা পড়ে জিনটিকে ধরে ফেলি। জিনটিকে ধরার পর সে বলছিল যে আমি আর চুরি করতে আসব না। এরপর আমি তাকে ছেড়ে দিই। এরপর হুজুর (সা.)-এর কাছে এলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, বন্দিকে কী করেছ? আমি বললাম, তাকে ধরেছিলাম। কিন্তু সে বলল, আর আসবে না। এ কথার ওপর তাকে মুক্তি দিয়েছি। এরপর হুজুর (সা.) বললেন, (দেখবে) সে আবার আসবে। ঠিকই আমি তাকে এভাবে দু-তিনবার ধরলাম। কিন্তু সে দ্বিতীয়বার না আসার অঙ্গীকার করলে তাকে আমি ছেড়ে দিই। এরপর আবার হুজুর (সা.)-এর কাছে এলে তিনি বলেন, বন্দিকে কী করলে? আমি বললাম, আবারও এলে তাকে বন্দি করেছিলাম। কিন্তু আবার না আসার ওয়াদা করলে ছেড়ে দিয়েছি। হুজুর (সা.) এবারও বললেন, দেখবে সে আবার আসবে। সত্যিই সে আবার এলে আমি তাকে শক্তভাবে ধরলে সে বলে, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাকে একটি বিষয় শিখিয়ে দিচ্ছি, তা হলো ‘আয়াতুল কুরসি’। এরপর তোমার কাছে আর কোনো দিন কোনো কিছু আসবে না। এরপর নবী (সা.)-এর কাছে এসে এ কথা বললে তিনি বলেন, যদিও সে মিথ্যাবাদী, কিন্তু এ কথাটি সে সত্যই বলেছে।

আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, একটি বন্দি জিন আমাকে বলেছে, যখন আপনি বিছানায় শুইতে যাবেন, তখন ‘আয়াতুল কুরসির’ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়বেন। তাহলে আপনি সেই রাতে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর হিফাজতের বহির্ভূত হবেন না। আর সকাল পর্যন্ত শয়তানও আপনার নিকটবর্তী হতে পারবে না। উপরন্তু সেই রাতে যা কিছু হবে, সবই কল্যাণকর হবে। পরিশেষে রাসুল (সা.) বললেন, সে মিথ্যাবাদী হলেও এটা সে সত্যই বলেছে। তবে হে আবু হুরায়রা! জানো কি, তুমি এ তিন রাত কার সঙ্গে কথা বলেছিলে? আমি বললাম, না। রাসুল (সা.) বললেন, সে ছিল শয়তান।

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সুরা বাকারার মধ্যে এমন একটি আয়াত রয়েছে, যে আয়াতটি পুরো কোরআনের নেতাস্বরূপ। তা পড়ে ঘরে প্রবেশ করলে শয়তান বের হয়ে যায়। তা হলো ‘আয়াতুল কুরসি’।

অন্য একটি হাদিসে আবু ইমামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়বে, তাকে মৃত্যু ছাড়া অন্য কিছু বেহেশতে যেতে বাধা দেয় না।

আয়াতে বলা হয়েছে, তাঁর অনুমতি ছাড়া কারো জন্য সুপারিশ করার সাহস কার আছে? যেমন শাফায়াতের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি আরশের নিচে গিয়ে সিজদায় পড়ে থাকব। আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা মোতাবেক আমাকে ডাকবেন আর বলবেন, মাথা তোলো এবং যা বলতে হয়, তা বলো, তোমার আবেদন শোনা হবে। তুমি সুপারিশ করলে তা গৃহীত হবে। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সুপারিশের জন্য আমাকে সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। অবশেষে তাদের আমি বেহেশতে নিয়ে যাব।

সূত্র : তাফসির ইবনে কাসির

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*