আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শ্রেণি ব্যবস্থাপনা কি ?

আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শ্রেণি ব্যবস্থাপনা কি জানুনএক সময় শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল শিক্ষক কেন্দ্রিক। বর্তমানে তা পাল্টে গিয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতি শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক হচ্ছে। তবে বর্তমানে মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক পাঠদান বা অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি জোরদার হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ করে কলেজগুলোতে অধিকাংশ পাঠদান পদ্ধতি শিক্ষক কেন্দ্রিক। যেখানে পাঠদান কালে শিক্ষক মূল ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তবে একথা মনে করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই যে, শিক্ষক কেন্দ্রিক পদ্ধতি অনুসরণে শিক্ষাদান কর্মকে বাস্তবায়িত করলে শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করবে। শিক্ষক কেন্দ্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে শিক্ষাদান কর্মকে সজীব করে তুলতে শিক্ষকের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষার্থীগণ তাদের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সজাগ রেখে শিক্ষক যা বলেন তা যদি বুঝতে বা অনুধাবন করতে কিংবা অনুসরণ করতে চেষ্টা না করে তবে শিক্ষকের ভূমিকা যতোই গুরুত্বপূর্ণ হোক, শিক্ষাদান সেখানে ব্যর্থ হতে বাধ্য। সুতরাং শিক্ষক কেন্দ্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতেও শিক্ষার্থীর ভূমিকা রয়েছে, তবে শিক্ষার্থীর ভূমিকা সেখানে প্রধান নয়। যে শিক্ষাদান পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকাই মুখ্য আর শিক্ষার্থীর ভূমিকা গৌণ, সেই শিক্ষাদান পদ্ধতিই বহুদিন থেকে আমাদের দেশে প্রচলন হয়ে আসছে। এ কারণেই শিক্ষক কেন্দ্রিক এ শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সনাতন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শিক্ষাদান কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ এবং সেখানকার অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। শিখনকে প্রয়োগমুখী করে গড়ে তোলার জন্য শ্রেণি ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যাবলি শ্রেণিকক্ষের সার্বিক বিন্যাস শিখনের উত্তম পরিবেশ তৈরির নির্ধায়ক। শিক্ষার্থীরা যতোক্ষণ বিদ্যালয়ে অবস্থান করে তার অধিকাংশ সময় শ্রেণি কক্ষে কাটান। তাই শ্রেণি কক্ষের সার্বিক পরিবেশ যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। সাধারণ অর্থে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বলতে শিক্ষাক্রমের আলোকে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের শিখন প্রক্রিয়াকে বুঝায়। সুষ্ঠু শ্রেণি শৃঙ্খলা এবং শ্রেণি ব্যবস্থাপনা ব্যতীত উত্তম পাঠদান তথা আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি প্রবর্তন করা সম্ভব নয়। তাই পাঠদান পদ্ধতিকে শিক্ষার্থীর হৃদয়গ্রাহী, তথ্যনির্ভর এবং আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষককে শ্রেণি ব্যবস্থাপনার ওপর জোড় দিতে হবে। উপযুক্ত পদ্ধতি ও কৌশলের মাধ্যমে পাঠদানকে ফলপ্রসূ করা এবং কার্যকরি পাঠ পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণকে শ্রেণি ব্যবস্থাপনা বলে। শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের সকল শিক্ষার্থীকে সুষম ও মানসম্মতন শিক্ষণ প্রদানের জন্য শ্রেণি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকদের ক্ষমতা প্রয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতামূলক হবে। অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণ শিখন পদ্ধতি চালু করে শিক্ষার্থীর শিক্ষণ শিখনের আংশিক দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে শ্রেণি কক্ষে শিক্ষক তার একচ্ছত্র আধিপত্য কমাবেন। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীগণ শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক- শিক্ষার্থী পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়ার জ্ঞান অর্জন করে থাকে।  শ্রেণি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে কোনো ক্রটি শিক্ষণ শিখনের আধুনিক এ পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নে ব্যাঘাত ঘটবে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষ এমনভাবে স্থাপন ও সাজানো উচিত যাতে শ্রেণি কক্ষটি সহজেই শিক্ষার্থীদের নিকট আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। নিজ গৃহে ছেলেমেয়েরা যেমন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে ঠিক তেমনি আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় করে শ্রেণিকক্ষ তৈরি করা দরকার। এ জন্য শ্রেণী কক্ষ থাকবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, শ্রেণি কক্ষের চার দেয়ালে সাজানো থাকবে বিভিন্ন মনীষীদের ছবি বা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট চার্ট, খোলা র‌্যাক কিংবা কাঁচের আলমারীতে সাজানো থাকবে বিভিন্ন রকম মডেল ও অন্যান্য শিক্ষোপকরণ,পর্যাপ্ত সংখ্যক বই, পত্রিকা ও সাময়িকী যা শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি হবে সম্পূর্ণ তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষকগণ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টোরের মাধ্যমে শিক্ষাদান করবেন ইহাই কাম্য। পৃথিবীর উন্নত বিশ্বের স্কুল/কলেজগুলোতে শিক্ষকগণ যেভাবে পাঠদান করে আসছে তাদের সাথে সমতা রক্ষা করে শিক্ষাদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। পুরনো ধ্যান ধারনা বাদ দিয়ে যুগোপযোগী পাঠদান পরিচালনাই আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি। সুতরাং আমাদের দেশে যে সকল শিক্ষাদান পদ্ধতি বহুল প্রচলিত হয়ে আসছে তার কয়েকটি পদ্ধতি আলোচনা করা হলো-  * শিক্ষক কেন্দ্রিক পদ্ধতি :  ১) বক্তৃতা পদ্ধতি (Lecture Method) : বক্তৃতা পদ্ধতি একটি একমুখী প্রক্রিয়া। শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীরা শোনে। শিক্ষক শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করার বা শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকেনা। বক্তৃতা পদ্ধতি ব্যবহার করে শিক্ষক মৌখিক বিবৃতির সাহায্যে শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীর কাছে উপস্থাপন করেন। এতে শিক্ষকের বাগি্নতা, বক্তৃতাদানের কলা কৌশল, বিষয়বস্তুকে শিক্ষার্থীর হৃদয়গ্রাহী করে তোলার ক্ষমতা, শিক্ষার্থীর বয়স, মেধা, আগ্রহ ইত্যাদি বিবেচনা করে শিক্ষনীয় বিষয়কে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতার উপর শিক্ষাদানের সার্থকতা অনেকাংশে নির্ভর করে। বক্তৃতা পদ্ধতি একমুখী প্রক্রিয়া হওয়াতে অত্যন্ত একঘেয়ে এবং সবচেয়ে কম ফলপ্রসু। অল্প বয়সী শিক্ষার্থীর জন্য এ পদ্ধতি একেবারেই উপযোগী নয়। প্রকৃতপক্ষে সত্যিকারের বক্তৃতা পদ্ধতিতে কোথাও পড়ানো হয় না। শিক্ষক বক্তৃতা পদ্ধতির সঙ্গে প্রয়োজনীয় কলা কৌশল যোগ করে একে ফলপ্রসূ করে তোলেন। বক্তৃতা পদ্ধতির প্রধান ক্রটি হলো, এতে শিক্ষার্থীর একটি মাত্র ইন্দ্রিয় সক্রিয় থাকে বক্তৃতা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়তার অভাব দেখা যায়। শ্রেণিকক্ষে নিষ্ক্রিয়ভাবে শিক্ষক শিক্ষিকার বক্তৃতা শুনে তারা পাঠের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই নীরবতা অবলম্বন করলেও শ্রেণির পাঠে তারা মনোযোগী থাকে না। এ পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো- আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি অনুসরণ করতে হলে পাঠ সহায়ক যে সকল উপকরণ ও তা সররাহ করার যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা আবশ্যক তা উন্নয়নশীল দেশসমূহে কঠিন হয়ে পড়ে। এ জন্য এ পদ্ধতির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। বক্তৃতা পদ্ধতিকে ফলপ্রসূ করতে হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির জন্য শিক্ষককে কল্পনাশক্তি ও রসবোধের পরিচয় দিতে হবে। প্রয়োজনীয় শিক্ষা সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষককে যথার্থ প্রস্তুতি নিয়ে শ্রেণি কক্ষে প্রবেশ করে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এবং প্রয়োজনে মূল বিষয়বস্তুর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ উপমা, উদাহরণ ও গল্প উপস্থাপন করতে হবে। যদিও বর্তমান শিক্ষাদান পদ্ধতিতে বক্তৃতা পদ্ধতি পরিহার করার জন্য বার বার বলা হচ্ছে। তবুও এ পদ্ধতি শতভাগ পরিহার করা সম্ভব নাও হতে পারে। শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে গিয়ে কোথাও না কোথাও একটু হলে এ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।  ২) প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি (Question Answer Method) : প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। শিক্ষক প্রশ্ন করেন শিক্ষার্থী উত্তর দেয়। এ পদ্ধতিতে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই, শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষককে প্রশ্ন করার কোনো অবকাশ নেই। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষক ছোট, ছোট প্রশ্নের মাধ্যমে পাঠের বিষয় বস্তুকে শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করেন। শিক্ষার্থীরা সে সকল প্রশ্নের উত্তর দান করে পাঠ্য বিষয় সর্ম্পকে ধারণা লাভ করতে তৎপর হয়। এই পদ্ধতির সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে শিক্ষকের প্রশ্ন করার দক্ষতা ও কৌশলের ওপর। কেবল প্রশ্ন এবং উত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে এ পদ্ধতিও একঘেয়ে। বাস্তবে প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির ব্যবহার নেই বললেই চলে। এই পদ্ধতিতেও শিক্ষকের ভূমিকাই প্রধান। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই এই পদ্ধতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়। এ পদ্ধতিকে ফলপ্রসূ করতে হলে শিক্ষার্থীকে যুক্তিতর্কের অবতারণা করতে উৎসাহী করতে হবে, প্রয়োজনবোধে শিক্ষক শিক্ষিকা পাঠসহায়ক শ্রবণ দর্শন উপকরণ ব্যবহার করতে পারেন। আনুষঙ্গিক উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মান অধিক উন্নত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি পাঠে উৎসাহ উদ্দীপনা বৃদ্ধিপায়। তবে এ পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষক শিক্ষিকার উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন এবং উচ্চ প্রশিক্ষণ গত সম্পন্ন হতে হবে। উৎকৃষ্ট মানের প্রশ্ন তৈরি করতে হলে মেধা সম্পন্ন শিক্ষক প্রয়োজন। তাছাড়া, শিক্ষক-শিক্ষিকার বিষয়বস্তু সর্ম্পকে পূর্ব প্রস্তুতি যথার্থ না থাকলে প্রশ্নোত্তর পদ্ধতিতে সফলতা আসে না।  ৩) প্রদর্শন পদ্ধতি (Demonstration Method) : প্রদর্শন পদ্ধতিও একটি একমুখী প্রক্রিয়া। বক্তৃতা পদ্ধতির সঙ্গে এর পার্থক্য হলো, শিক্ষার্থীর দুটি ইন্দ্রিয় এতে সক্রিয় থাকে। শিক্ষার্থী শোনে এবং দেখে। শ্রেণি পাঠদানে কোনো বাস্তব ঘটনার বা বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া প্রদর্শন পদ্ধতি নামে অভিহিত। বক্তৃতাদান পদ্ধতিতে শিক্ষক কেবল মৌখিক বিবৃতির মাধ্যমে কোনো বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করেন। পক্ষান্তরে, প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষক উপস্থাপকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে, বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের সাহায্যে এবং মৌখিক বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয়গম করতে সচেষ্ট হন। প্রদর্শন পদ্ধতিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কিছু করে দেখান। শিক্ষার্থীরা কিছু ঘটতে দেখে। শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে শিক্ষার্থীদের নীরব শ্রোতা ও দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকা ছাড়া পাঠে সারাসরি অংশ গ্রহণের সুযোগ কম। এ সকল কারণে প্রদর্শন পদ্ধতিও শিক্ষক কেন্দ্রিক। প্রদর্শন পদ্ধতির সবচেয়ে ফল দায়ক দিক হলো- এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর সজাগ ও সক্রিয় থেকে পাঠ্য বিষয় অনুধাবন করতে হয় ফলে পাঠ বহুলাংশে ফলপ্রসূ হয়। প্রদর্শন পদ্ধতিতে সার্থকভাবে পাঠদান করতে পারলে শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষনীয় বিষয় বস্তুটি স্থায়ী হয়। কারণ, সে দেখে শুনে বিচার করে শিক্ষণীয় বিষয়কে গ্রহণ করে। আবার, এ পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য ক্রটিহলো- শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে প্রদর্শন পদ্ধতিতে পাঠদান অসম্ভব হয়ে ওঠে। কারণ শিক্ষককে একই সঙ্গে মৌখিকভাবে উপস্থাপন ও উপকারণ ব্যবহার এবং শ্রেণি শৃঙ্খলার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হয়।  ৪) টিউটোরিয়াল পদ্ধতি (Tutorial Method) : টিউটোরিয়াল একটি সুপ্রাচীন পদ্ধতি। গ্রীক মুনিষী সক্রেটিস এই পদ্ধতির প্রর্বতক বলে একে সক্রেটিকে পদ্ধতি নামেও অভিহিত করা হয়। এতে শিক্ষক জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো চিহৃিত করে তা প্রশ্নকারে উপস্থাপন করেন। শিক্ষার্থীরা সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে তাদের চিন্তা ও যুক্তির অবতারণা করে। এভাবে পরস্পারিক আলাপ আলোচনার উত্তর প্রত্যুত্তরের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রকৃষ্ট উপায় নিদের্শ করা হয়। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগানো হয়। শিক্ষক সাহায্যকারী ও পরামর্শ দাতার ভূমিকা পালন করেন। আধুনিক কালে এই পদ্ধতি নবতর রূপ লাভ করেছে। বর্তমানে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে উচ্চতর শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পাঠের বিশেষ দিকগুলো সর্ম্পকে স্পষ্ট ধারণা দান করা হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের পাঠের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ওপর প্রশ্নোত্তর লিখতে বা নিবন্ধ রচনা করতে দেয়া হয়। এজন্য ছাত্র সংখ্যা সীমিত রাখা হয়। ছাত্র সংখ্যা বেশি হলে এ পদ্ধতি কার্যকর হয় না। বস্তুত টিউটোরিয়াল পদ্ধতিও শিক্ষক কেন্দ্রিক পাঠদান পদ্ধতির একটি উন্নত ব্যবস্থা। বক্তৃতাদান পদ্ধতির তুলনায় এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের অধিক সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হয়। বিশেষ করে এই পদ্ধতির অধীনে যে সমস্ত টিউটোরিয়াল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তাতে ভালো ফলাফল অর্জন করতে হলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বিষয়ে মনোযোগী হতে হয়।  ৫) পূর্ব নির্ধারিত পাঠ (Assignment) : এই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষক নিজে পাঠ্য বিষয়ে আলোচনা করার পূর্বেই শিক্ষার্থীদের নিজেদেরকে পাঠ্য বিষয়টি অনুশীলনের মাধ্যমে অনুধাবন করার নির্দেশ দান করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বিষয় সর্ম্পকে চিন্তা ভাবনাও মতামত প্রকাশ করার সুযোগ পায়। শিক্ষক পাঠ্য বিষয়ে সহায়ক গ্রন্থ সম্পৃক্ত নির্দেশ দান করেন। শিক্ষক/শিক্ষিকার নির্দেশ মতো শিক্ষার্থীরা পাঠ্য বিষয়টি পড়ে ও বুঝে নিজেরাই তার মর্ম গ্রহণে তৎপর হয়। ফলে কল্পনা শক্তি, বিচার- বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সাহায্যদান করেন। এই পদ্ধতি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পাঠদান পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। এটি অন্য যে কোনো পাঠদান পদ্ধতির আনুষঙ্গিক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।  * শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক পদ্ধতি : আধুনিক শিক্ষণ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর নিজস্ব প্রয়োজন, সামর্থ্য, আগ্রহ, পছন্দ- অপছন্দের উপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও শিক্ষা পদ্ধতির আমুল সংস্কারের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই শিক্ষণ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, শিক্ষার্থীর স্বাধীনতার স্বীকৃতি, শিখনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ, তার পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ, সুশৃঙ্খল মানব শক্তির অধিকারী করে তোলা, সৃজনশীলতার উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং ব্যক্তি সত্ত্বার পূর্ণ বিকাশ। সুতরাং শিক্ষার্থী কেন্দ্রিয় শিক্ষা পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে আলোচনা করা হলো-  ৬) আলোচনা পদ্ধতি (Descussion Method) : এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা সুনিদিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখে কোনো একটি সমস্যার সমাধান বের করার জন্য পারস্পরিক আলোচনা লিপ্ত হয়। তারা সমস্যাটির বিভিন্ন দিক সর্ম্পকে মতো বিনিময় করে তথ্য সংগ্রহ করে। সমস্যার স্বরূপ ও পরিধি সমন্ধে স্পষ্ট ধারণা লাভ করার পর দায়ী কারণগুলো সনাক্ত করে। সবদিক বিবেচনার পর তারা সম্ভাব্য সমাধানের পথ খুঁজে নেয়। শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি বসে স্বাধীনভাবে আলোচনা করলেও সমস্ত আলোচনা শিক্ষক/শিক্ষিকা বা দল নেতা কর্তৃক পরিচালিত হয়। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা নিজের চেষ্টায় শিখতে পারে এবং স্ব-চেষ্টায় জ্ঞান অর্জন করার ফলে তা স্থায়ী হয়। এই পদ্ধতির সুফল দিক হলো শিক্ষার্থীরা মুখস্থ বিদ্যার উপর নির্ভরশীল হতে হয় না। বিষয় জ্ঞান গভীর না হলে আলোচনায় অংশগ্রহণ করা কঠিন হয়। তাছাড়া, এই পদ্ধতিতে শিক্ষকের ভূমিকা কম এবং শিক্ষার্থীর ভূমিকাই প্রধান। তবে আলোচনা পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য ক্রটি হলো ইহা উন্নত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী, মাঝারী এবং নিম্ন মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এই পদ্ধতি ফলদায়ক নয়।  ৭) প্যানেল আলোচনা পদ্ধতি (Panel) : প্যানেল কথাটি বলতে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য মনোনীত এক দল লোককে বুঝায়। এই পদ্ধতি সাধারণ আলোচনা পদ্ধতিরই একটি বিশিষ্ট্য রূপ। এই ধরনের আলোচনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে কয়েক জনকে আগে থেকে মনোনয়ন দান করা হয়। সেই প্যানেলভুক্ত শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট বিষয়ে প্রয়োজনীয় তত্ত্ব ও তথ্য সংগ্রহ করে তা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করে। প্যানেলে সাধারণঃ চার থেকে আটজন প্রতিনিধি থাকে। শিক্ষক আলোচনা পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমে আলোচ্য বিষয়টি সবার সম্মুখে তুলে ধরেন এবং আলোচনার শুরুতে প্রতিনিধিদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে দেন। শিক্ষক প্যানেলভুক্ত সদস্যদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের দায়িত্বও পালন করে থাকেন। সাধারনতঃ আলোচনা পদ্ধতির মতোই প্যানেল আলোচনা পদ্ধতিরও একই ধরনের গুণাগুণ বিদ্যমান।  ৮) সেমিনার (Seminar) : সাধারণ অর্থে সেমিনার বলতে আলোচনা ও গবেষণার জন্য বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছোট ক্লাসকে বোঝানো হয়। এই পদ্ধতি সাধারণত ঃ বয়স্ক ও উচ্চ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যই অধিক উপযোগী। কলেজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও সমস্যামূলক কোনো বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উচ্চ শ্রেণিতেও সেমিনার পদ্ধতি অনুসরণ করা যেত পারে। সেমিনারে অংশ গ্রহণকারীরা পূর্ব নির্ধারিত সমস্যামূলক বিষয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করে এ জন্য তারা প্রাসঙ্গিক গ্রন্থাদি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বক্তব্য বিষয়টিকে তথ্যাশ্রয়ী করে তোলে। এই কাজ তারা ব্যাক্তিগত প্রচেষ্টায় এককভাবে করতে পারে। আবার ছোট ছোট দলগঠন করেও করতে পারে। তথ্যাদি সংগ্রহের পর নির্ধারিত দিনে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের পূর্বে সংগৃহীত তথ্যের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করা হয় এবং মূল্যায়ন করা হয়। সেমিনার শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং স্বয়ং শিক্ষা লাভের এটি একটি উৎকৃষ্ট উপায়। আমাদের দেশে বর্তমানে দৈনিক ক্লাস রুটিন অনুসরণ করে শ্রেণি পাঠদানের বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে সেমিনার পদ্ধতি তেমন উপযোগী নয়। তবে শিক্ষা ক্রমিক কার্যক্রমের জন্য সেমিনার পদ্ধতি অনুসৃত হতে পারে।  ৯) সিম্পোজিয়া (Sympozia) :- সিম্পোজিয়া শব্দের আভির্ধানিক অর্থ সুনিদির্ষ্ট ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কোনো বিষয়ে বিভিন্ন মতের সংগ্রহ করা। এটিও এক প্রকার দলগত আলোচনা। তবে পরিচালনার দিক থেকে এর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। সিম্পোজিয়া পদ্ধতিতে দুই বা ততোধিক শিক্ষার্থী আলোচ্য বিষয় বা সমস্যার ওপর আগেই প্রবন্ধ রচনা করে নিয়ে আসে। তারা প্রথমে তাদের লিখিত প্রবন্ধ কিংবা মৌখিক বিবৃতি পেশ করে। বিভিন্ন বক্তা বিষয়টির উপর নতুন তথ্য পরিবেশন করে। এইভাবে কয়েকটি বক্তৃতার মাধ্যমে বিষয়গুলো আলোচিত ও বিশ্লেষিত হয়। নির্দিষ্ট বিষয়ে বক্তার পূর্ব প্রস্তুতি থাকে বলে আলোচনাটি সুসংহিত রূপ লাভ করে। বিভিন্ন বক্তা সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে থাকে। শ্রেণি পাঠদানে এটি তেমন উপযোগী না হলেও মাঝে মধ্যে পাঠদান কালেও পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক এটি ব্যবহৃত হতে পারে।  উপরের আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, আধুনিক যুগে পাঠদান পদ্ধতি আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত হতে হবে। বহুকাল ধরে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পুস্তুক পাঠ ও বক্তৃতা পদ্ধতি ছিল পাঠদানে মূল সূত্র। বর্তমানে বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য নানা কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে, সেই কৌশলগুলো প্রয়োগ করে যথাযথ ভাবে শিক্ষককে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। বর্তমান শিক্ষাদান পদ্ধতি হাতে কলমে উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে করতে হয়। বিষয় বস্তুর সাথে মিল রেখে শিক্ষক নিজেই উপকরণ তৈরি করে শিক্ষাদান কার্য পরিচালনা করবেন। শিক্ষকতা হলো এক ধরনের সৃষ্টি ধর্মী প্রক্রিয়া, শিক্ষকতা কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিত্তিক কর্মপরিচালনার সময় শিক্ষককে যান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হলে চলবে না। শিক্ষকের নিজস্ববুদ্ধি বিবেচনা ও চিন্তা শক্তি প্রয়োগের অবকাশ থেকে যায়। শিক্ষকতা তখনই সার্থক ও সফল হবে যখন শিক্ষার্থীর শিখন হয় সহজ ও স্বতঃ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকের মতো কলেজ শিক্ষাকদেরও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষায় এম, এড ডিগ্রি অর্জন করা উচিত। কারণ ভাল শিক্ষক হতে হলে এবং উত্তম ও যুগোপযোগী শিক্ষাদান করতে হলে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নাই। জন্মগতভাবে ভাল শিক্ষকের সংখ্যা অতি নগণ্য। অথচ শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং যাত শিক্ষক ছাড়া আরো অনেক শিক্ষক আছেন যাদের শিক্ষাদান সর্ম্পকে যথাযথ জ্ঞানাজর্নের জন্য প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। তাদের জন্য পদ্ধতি সংক্রান্ত জ্ঞান অপরিহার্য। তাছাড়া, ভাল শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিলে তিনি আরো ভাল শিক্ষক হতে পারেন। তাই বৃত্তি বিচারে সকল প্রকার শিক্ষকের বিষয়বস্তু সর্ম্পকে যেমন গভীর জ্ঞানঅর্জন করা প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষাদান পদ্ধতি সর্ম্পকে ব্যবহারিক গবেষণাও নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনে আত্মনিয়োগ করা উচিত। পরিশেষে, একথা বলা যায় যে, একজন আদর্শ জাত শিক্ষক তার মেধা ও মনন শক্তি খাটিয়ে বুঝতে পারবেন কোনো পদ্ধতিতে পাঠদান করলে শতভাগ সফল হবেন। ঠিক তিনি সে পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করবেন ইহাই-যতার্থ। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকের নিজস্ব কৌশল হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম কৌশল। তবে শিক্ষককে খেয়াল রাখতে হবে যে, শ্রেণি শাসন কিংবা শ্রেণি নিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষার্থীদেরকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে আঘাত বা চাপ দেয়া উচিত নয়। প্রয়োজনে বডিল্যাঙ্গগুয়েজ ব্যবহার করে শিক্ষাদান কার্যক্রমকে আনন্দ শ্রুতিমধুর এবং প্রাঞ্জল করে তুলবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*