জান্নাতের নেয়ামতরাজি ও তার বর্ণনা :

image_pdfimage_print

জান্নাতের নেয়ামতরাজি ও তার বর্ণনা :

জান্নাত’ শব্দের অর্থ- বাগান, পার্ক, গার্ডেন, উদ্যান ইত্যাদি। জান্নাতের বৈশিষ্ট হুবহু বর্ণনা করা তো দূরের কথা কল্পনা করাও অসম্ভব। মুসলিম শরীফের রেওয়াতে আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, “তাতে আছে এমন জিনিস যা কোন চক্ষু কোন দিন দেখেনি, কোন কান কোন দিন শুনেনি, কোন অন্তর কোন দিন কল্পনাও করেনি” আল্লাহ বলেন, “তারা তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে (অর্থাৎ কম ঘুমায়)  তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে (জাহান্নামের) ভয়ে ও (জান্নাতের) আশায় এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি, তার থেকে তারা খরচ করে, কোন আত্মা জানে না যে, তার কৃতকর্মের কারণে কি নয়ন প্রীতিকর প্রতিদান লুকায়িত আছে।” [সূরা সেজদা- ১৭]
জান্নাতের আটটি নাম হলো, এক. ‘দারুসসলাম’ (নিরাপত্তার ঘর) দুই. ‘দারুল মুত্তাকীন’ (পরহেযগারদের ঘর) তিন. ‘দারুল কারার’ (স্থায়ী বসবাসের গৃহ) চার. ‘মাকামুল আমীন’ (নিরাপদ স্থান) পাঁচ. ‘জান্নাতে নায়ীম’ (নেয়ামতে ভরপুর জান্নাত) ছয়. ‘জান্নাতে আদন’ সাত. ‘জান্নাতুল বাকী’ আট. সর্বউচ্চ জান্নাত ‘জান্নাতুল ফেরদাউস’ তার থেকেই অন্যান্য জান্নাতের নদ-নদী ও ঝর্ণা প্রবাহিত হয় এবং তার উপরে হলো আল্লাহ পাকের আরশ। কাব বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, যারা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে তারা জান্নাতুল ফেরদাউসে থাকবে।’ [ইবনে কাসীর] জান্নাতের একশত স্তর আছে একেক স্তর আসমান ও যমীনের দূরত্ব সমপরিমান।’ [তাফসির তাবারী] আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা. কত হাজার বার কুরআন ও হাদীসে জান্নাতের কথা বর্ণনা করেছেন, বলে শেষ করা যাবে না। এই পৃথিবীর সৌন্দর্য আকাশ বাতাস যমীন ‘কূন’ (হয়ে যাও) শব্দ দিয়ে তৈরি করেছেন। পক্ষান্তরে জান্নাত আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে তৈরি করেছেন। প্রতিদিন তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের কৃতকর্মে খুশি হয়ে জান্নাতকে পাঁচবার সাজান এবং বলেন, হে জান্নাত! ‘তুমি আমার প্রিয় বান্দাদের জন্য আরো সুন্দর হয়ে যাও।’ [তাফসির কুরতুবী]
এই পৃথিবীতে মানুষ একটু সুখে বাস করার জন্য ভেতর বাহির আভিজাত্যে ঠাসা, আধুনিক নির্মাণশৈলী বিশালতায় দৃষ্টি নন্দন, কৌতুহলী আলিশান বাড়ি নির্মান করে, যার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য উপর নিচ মার্বেল পাথর খচিত, শ্বেত পাথরে মোঁড়ানো, প্রতিটি রুম ইরানী কার্পেট, মালশিয়ার ঝাঁড়বাতি, সিঙ্গাপুরের ট্যাপকল, ইটালীর দরজা জানালার লক, জাপানি ফিটিংগে সারীবদ্ধ গার্ডেন লাইট, প্রাচীরের মধ্যে সারিবদ্ধ সংযুক্ত লাইট, ইন্দোনিশিয়ান টাইলস ফিটিং করে, নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থায় মোড়ানো সি.সি ক্যামেরা, যা প্রতিটি মূহুর্তের ধূলিকনার উড়াউড়ি রেকর্ড করে ফেলে, প্রতিটি কক্ষে ওয়ালেট সংযোজন, বিশেষ কায়দায় আলমারী স্থাপন করে মদ, নারী নেশা চরিতার্থ করার জন্য গোপন কক্ষ তৈরি করা হয়। ছাদের উপর বসে জ্যোস্না রাত্রি উপভোগ করার জন্য কাঁচে ঘেরা মনোরম ব্যবস্থা। বাড়ির কালার হালকা জিংকি, সেই কালারের সাথে তাল মিলিয়ে সাহেবের জন্য করাচীর বিখ্যাত পাঞ্জাবী, বেগমের জন্য নৈনিতালের পিংকি শাড়ি, আরো কত কিছু করে বেড়ায়। হয়তবা দেশীয় খাবার পেটে হজম না হলে, জনগনের টাকায় ইউরোপীয় উচ্চ বিলাসী খাবার কিনে খাবে এর বেশী কিছু কি করতে পারবে! আবার সেই বাড়ির সৌন্দর্য ও জুলুস দেখার জন্য কৌতুহলী মানুষের ভীড় জমে। আবার দুনিয়ার ধনবান সুখি ব্যক্তিদের মুখমন্ডলে সাধারণতঃ খুশির আভা সজীবতা প্রকাশ পায় যা তাদের আরাম, আয়েশ, পার্থিব সম্পদলাভ ও তাদের মাল-সম্পদের আধিক্যের ফলে হয়ে থাকে। ঠিক তেমনি জান্নাতিদেরকেও তাদের মান-সম্মান, পদ-মর্যাদা নানান প্রকার সুখ-সমৃদ্ধির আধিক্যের কারণে তাদের মুখ-মন্ডলের রুপ-সৌন্দর্য, লাবণ্য ও ঔজ্জ্বল্যে চেনা যাবে যে, তারা জান্নাতি।
আমাদেরকে আল্লাহ তাআলা কিছু দিনের জন্য পরীক্ষা সরূপ এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এই সামান্য সময় আল্লাহর হুকুম মোতাবেক চললে এমন জান্নাতের ওয়াদা করেছেন, যার পাদ্বদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নির্ঝরিণী ও উদ্যানরাজি চমৎকার প্রতিদান স্বরুপ আনন্দময় জীবন যাপনের জন্য এমন আয়তনয়না কুমারী, নব-যুবতী, অবিবাহিতা, সচ্চরিত্রা, সতী, পবিত্রা, আকর্ষণীয় চোখ বিশিষ্ট সুন্দরী-সুদর্শনা রমণীকুল যারা দুনিয়ার নারীদের মতো আগুন, পানি, মাটি ও হাওয়া দিয়ে তৈরি নয়; বরং মিসক, আম্বর, জাফরান ও কাঁপুর দ্বারা বিশেষ রুপে সৃষ্টি করা হয়েছে। যাদের দেহের রুপ-স্বচ্ছতার কারণে পদনালীর মজ্জা হাড়ও মাংশের বাহির থেকে পরিদৃষ্ট হবে। দুনিয়ার মাটি দিয়ে তৈরি রমণীগণ এত মায়াবী হলে, জান্নাতের রমণীগণ কেমন হবে? যারা সমুদ্রের লোনা পানিতে থুতু ফেললে তা মিষ্টি হয়ে যাবে। একবার মুয়ানাকা করলে চল্লিশ বৎসর পার হয়ে যাবে, ডানে বামে তাকানোর সময় পাবে না। জান্নাতের হুরে আইন যখন তার সামনে ছন্দময় তালে হাঁটবে হাজার স্টাইল, ভাব-ভঙ্গিমা প্রকাশ করবে, যাতে তোমার চোখ আচমকা জান্নাতি রমণীর সৌন্দর্য উপভোগ করবে। আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের জন্য বিশেষ দুটি বাগান থাকবে, যা সাধারণ জান্নাতিদের তুলনায় উত্তম হবে।
জান্নাতিকে দুষ্ট কথা ও মিষ্টি হাসির মাধ্যমে চক্ষু শীতল ও অন্তর জুড়ানোর জন্য তার সামনে ঘোরাফেরা করবে ছোট ছোট চিরসুরক্ষিত মোতিসাদৃশ শিশুÑকিশোর, বালকÑবালিকা, দেখতে মনে হবে যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা ছড়ানো আছে। জান্নাতের এক বিঘত জায়গা পৃথিবীর সমস্ত  হীরা, মনী-মুক্তা, সোনা-গহনা, রুপা-চাঁদি, সমস্ত  ধন-দৌলত দিয়েও কেনা সম্ভব হবে না। জান্নাতিদের সব ইচ্ছা চোখের পলকের মধ্যে পূরণ হয়ে যাবে। সেখানে তাদের দৃষ্টি মনে-প্রাণে পরিতৃপ্তি লাভ করবে। সেখানে জান্নাতিদের চেহারা থাকবে সবসময় স্বাচ্ছন্দ্যে দীপ্তিমান, প্রশান্ত, প্রসন্ন ও হাস্যজ্জ্বল। সেখানে থাকবে না কোন অসার-অনর্থক কথা-বার্তা, গালি-গালাজ, হিংসা-বিদ্বেষ, মনো-মালিন্য, পারষ্পরিক দ্বিধা-দ্বন্দ, বিবাধ-বিচ্ছেদ, দুঃখ-দুর্দশা, ভুল-ত্র“টি, বেদনা-মুসীবত, রাগ-গোস্বা, কমতি-ঘাটতি, হতাশা-নিরাশা, অভাব-অনটন, কষ্ট-পরিশ্রম বলতে যা বুঝায়। তারা হবে সেখানে চিরস্থায়ী, থাকবেনা কোন রোগ-ব্যাধি, ভয়-ভীতি, দুর্বলতা-অক্ষমতা, বার্ধক্যতা, অজ্ঞানতা-অচেতনতা, ক্ষুধা-বস্ত্রহীনতা কোন কিছুই থাকবে না। সেখানে থাকবে আভিজাত্যে ঠাসা সু-সজ্জিত সবুজ মসনদ, উৎকৃষ্ট দুর্লভ মূল্যবান রেশমী বিছানার আসন মিহি সবুজ রেশমী বস্ত্রে বিছানো হেলানদ্বার ইজি চেয়ার, সংরক্ষিত সোনা-চাঁদীর পানপাত্র, সারি সারি গালিচা, বিস্তৃত বিছানো কার্পেট, কাঁটাহীন কুল-বৃক্ষ কাঁধি কাঁধি কলা, ঘন ঘন দীর্ঘ সুনীবিড় ছায়াদার পল্লব বিশিষ্ট বৃক্ষ, প্রবাহমান ঝর্ণাধারা, সমুন্নত সু-সজ্জিত রেশমী আস্তর বিশিষ্ট আসন, মুক্ত পবিবেশ, রৌদ্রতাপ-শ্বৈত্যহীন নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া, আনন্দ উদযাপনের বিশেষ স্থান সমূহ, সোনা-চাঁদীর পান পাত্র, শান্ত মনে নাগালের আয়ত্বে শুয়ে, বসে, দাঁড়িয়ে, হেঁটে গ্রহণ করার মতো সুস্বাদু ফল-মূলের প্রাচুর্য, খেঁজুর, আঁঙ্গুর-আনার, দুনিয়ার যত ফল-মূল আছে কিংবা আল্লাহর জ্ঞানে আরো নতুন নতুন নামের ফল-ফলাদি, যা সকালে খেলে এক মজা, বিকেলে আরেক মজা, দুপুরে আরেক মজা, আজকে এক মজা, কালকে আরেক মজা, এক সপ্তাহ পরে খেলে আরেক মজা, এক মাস পর অন্য মজা, শুধু মজা আর মজা, নিত্য-নতুন মজা, মজার কোন শেষ নেই, একটি খেঁজুর বার হাত লম্বা (বালতি বা মটকার মতো মোটা) তার আগাতে এক মজা গোড়াতে আরেক মজা, মাঝখানে আরেক মজা, এক জন এক হাজার জনের খাবার খেতে পারবে, মূহর্তের মধ্যে হজম হয়ে যাবে, সেই পরিমান জৈবিক চাহিদা তৈরি হবে।
[কিতাবু মুকাশিফাতিল কুলুব, ঈমাম গাজ্জালী র. ২৮৯ পৃষ্ঠা]
স্ত্রীরা কখনো অনীহা প্রকাশ করবে না। পেশাব,পায়খানা, নাকে শ্লেষ্মা থাকবে না, শরীর থেকে মিশকের ঘাম ও ঢেঁকুরের মাধ্যমে খাদ্য হজম হবে। হাঁটতে চাইলে পা থাকবে, উড়তে চাইলে ডানা থাকবে, সাঁতরাইতে চাইলে পেখম থাকবে, দ্রুত কোথাও যাইতে চাইলে মারসিডিজ, লেন্ডক্রোয়েজার, লেক্সাস গাড়ি, নৌকা, স্পীডবোট, লঞ্চ, স্টীমার, সাবমেরিন, জাহাজ, শিপ, নেভী আরো দ্রুত চলতে চাইলে নির্ভয়ে নিজে পাইলট হওয়ার মতো সীমিত-অসীমিত আসনের বিমান, রকেট, উরোজাহাজ বা পাথফাইন্ডার কিংবা আল্লাহর জ্ঞানে নতুন নতুন সৃষ্টি আবিষ্কার করে বান্দাকে আনন্দ দেওয়ার অনুভূতি। জান্নাতে বিভিন্ন আকৃতির সংরক্ষিত হীরা, মনী-মুক্তার ন্যায় রমণীগণ হবে বিমান-বালা, দুনিয়ার সুসন্তানেরা তাদের আদর্শ বাপ-দাদা ও নিকটাত্মীয়দের কাছে বেড়াতে যাবে কিংবা দূর থেকে  খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য টেলিফোন, ইন্টারনেট, ই-মেইল ও ফোন-ফ্যাক্সসহ থাকবে আরো অত্যাধুনিক সুব্যবস্থা। সাপ্তাহে একবার কিংবা মাসে একবার উচ্চস্তরের জান্নাতিরা নিম্মস্তরের জান্নাতিদের সাথে মত বিনিময় করা কিংবা সম্মিলিত ভাবে আনন্দ উপভোগ করার জন্য থাকবে অডিটরিয়াম, স্টেডিয়াম, থিয়েটার, সেখানে তারা পরষ্পর মুখোমুখি হয়ে সুসজ্জিত আসনে সমাসীন হবে। সেখানে থাকবে সবুজ বাগ-বাগিচা, স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত পান পাত্র ও থলে স্বচ্ছ-সুশুভ্র, সু-স্বাদু ও রুচী-সম্মত খাবার ও সদা প্রবাহমান সু-স্বাদু শুঁঠ-মিশ্রিত পানীয়। কস্তুরীর সুগন্ধিযুক্ত শরবত পরিবেশন করা হবে। খানা-পিনার সময় অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় মত্ত থাকবে।
জান্নাতের সেবক-সেবিকা হবে মুক্তার ন্যায় ফুটফুটে। সুন্দর সুন্দর সিনারী, সুমুদ্র-সৈকত, সবুজ শস্য-শ্যামল পাহাড়-পর্বত, চারণ ভূমি, টিলা, উপত্যকা ও সুশীতল ছায়াদার পল্লব থাকবে। সেখানে আরো থাকবে উরন্ত পাখি-পক্ষির কল-কাকলী, প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের লীলাভুমি, জুটিবদ্ধভাবে ও চক্রাকারে উড়ে বেড়ানো পাখির কিচিরমিচি শব্দ সুরের আবহ বিরাজ করবে। অহিংস্র জীব-জন্তু যাদেরকে নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে আনন্দ উপভোগ ও অবলোকন করবে। তাছাড়া আরো থাকবে আল্লাহ পাকের অন্যন্য সৃষ্টি, যার জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে নেই। আল্লাহ বলেন, “তোমাদেরকে সামান্যতম জ্ঞান দেওয়া হয়েছে। [সূরা ইসরা ৮৫] আল্লাহর জ্ঞানে সাত আকাশ সাত যমীন ছাড়া আরো কত কিছু সৃষ্টি করে রেখেছেন, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। সেগুলি জান্নাতে গেলে আল্লাহ দেখাবেন টিভি, ডিস ও ইন্টানেটের মতো। ‘মানুষের জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় সমুদ্র থেকে একফোটা পানি উঠানোর মতো’। এর পরও বৈজ্ঞানিকরা অস্থির হয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যের বিশালত্ব দেখে, কিন্তু আল্লাহকে মানতে নারাজ। কারণ দাজ্জালের মতো তাদের ডান চোখ অন্ধ। বাম চোখ দিয়ে শুধু দুনিয়ার বাহ্যিক সৌন্দর্যটাই দেখতে পায়। এবং আমাদের দিশেহারা নতুন প্রজন্ম তাদের সেই প্রবল পানির জোয়ারের মত অন্ধ প্রগতি নামের দুর্গতি, ডিজিটাল নামের মেন্টালিটি ও আধুনিকতা নামের বেহায়াপনার দিকে ধাবিত। এক সাহাবী প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাতে উট আছে? হুজুর সা, বললেন, আছে যার খুর ইয়াকুত পাথরের, যার ডানা জামাররুদের নির্মিত থাকবে যেখানেই যেতে চাইবে সেখানেই পৌঁছে দিবে আল্লাহর রাসূল বলেন, “কেউ আগুন জ্বালালে যেমন তার চতুর্দিকে মশা-মাছি, ফরিং সহ সমস্ত কীট-পতঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়ে, আমি নবী সেই আগুনের ঝাঁপ থেকে তোমাদের রক্ষা করি। দুনিয়ার চোখ ধাঁধানো চাক-চিক্য, জাঁক-জঁমক সেই জ্বলন্ত আগুন। সেই নবুওতের দায়িত্ব আলেম ওলামা বক্তৃতা-বিবৃতি, লিখনি ও ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে নিয়েছে বিধায় আজ তারা জেল-যুলুম, নির্যাতন সহ্য করছে কারাগারের অন্ধ কুটরায়। আল্লাহ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।
দুনিয়াতে যেসব আনন্দ আল্লাহর ভয়ে উপভোগ করেনি, জান্নাতে সেগুলোর কথা মনে পড়লে, সেগুলো উপভোগ করার সুব্যবস্থা কিছুদিন পর পর দেয়া হবে। নতুন নতুন আকৃতি সৌন্দর্যে পদ্মারাগ ও প্রবাল সদৃশ করে লাজুক ভাব-ভঙ্গিমার স্ত্রী দেয়া হবে প্রাণভরে স্বামীভক্তিপূর্ণ কুমারী, কামিনী, সমবয়স্কা স্ত্রী, যারা স্বামীর সেবায় নিমগ্ন থাকবে। যারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে পদ্মারাগ, শুভ্রতামিশ্রিত রক্তবর্ণের মতো লাল সুন্দরী। আল্লাহ বলেন, “আমার কাছে আছে অতিরিক্ত” সূরা ক্বফ (অর্থাৎ কিছু দিন পর পর নিত্য-নতুন অঙ্গ-সাজে আবিষ্কার করে নিত্য-নতুনত্যে সৃষ্ট রমণীকুল) ইবনে কাসীর। [কিতাবু তাসফিয়াতিল কুলুব ঈমাম ইয়াহইয়া জাম্মার ৫৩৮ পৃষ্ঠা
তাদের পরণে থাকবে চিকন মোটা সবুজ-শ্যামল-পিংকি কালার রেশমি বস্ত্র, শাড়ি, জান্নাতি  পাঞ্জাবী, সোনা-রোপা-হীরা-পরশ-পাথর-মনী-মুক্তা জান্নাতি জামাররুদ পাথর দ্বারা নির্মিত কংকণ। সেখানকার বাগ-বাগিচা গুলো হবে বিস্তৃর্ণ সাম্রাজ্যের ন্যায় দৃশ্যমান, যাতে প্রবাহিত হবে ‘সালসাবীল’ নামক ঝর্ণা, ‘কাফুর’ নামক ঝর্ণা, ‘যানযাবীল’ নামক ঝর্ণা,‘তাসনীম’ নামক ঝর্ণা,  ‘মাখতুম’ নামক ঝর্ণা যার থেকে জান্নাতি নেশাহীন সুমিষ্ট মদের নদী, সুস্বাদু দুধের নদী, স্বচ্ছ মধুর নদী, সুমিষ্ট পানির নদী প্রবাহিত হবে। যাতে থাকবে আদার স্বাদ মিশ্রিত, কাঁফুরের স্বাদ মিশ্রিত ফোয়ারার ন্যায় উদ্বেলিত এমন দুই প্রশ্রবণ। জান্নাতিদের আত্মতৃপ্তি ও চক্ষু শীতলের জন্য সর্বদা পানির ঝর্ণা ও জলপ্রবাতও থাকবে। ‘জান্নাতের সামান্য পরিমান নেয়ামত দুনিয়াতে প্রকাশ পেলে দুনিয়া আলোকিত হয়ে যাবে’। ‘জান্নাতে মৃত্যু থাকলে জান্নাতিরা জান্নাতের নেয়ামত দেখলে মরে যেত। [তিরমিযী] ‘জান্নাতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বৎসরের দুরত্ব থেকে পাওয়া যাবে। [বোখারী]
‘দুনিয়াতে সারা জীবন দুঃখ-কষ্টে অতিক্রমকারী জান্নাতে চোখের পলক পড়লেই দুনিয়ার সকল দুঃখ-বেদনা ভুলে যাবে। [মুসলিম] ‘জান্নাতে কোন আফসোস থাকবে না, তবে শুধু আফসোস করবে দুনিয়ার ঐ সময়ের জন্য যেটা (হেসে, খেলে ও আড্ডা মেরে) পাস করেছে। [তাবারানী] ‘জান্নাতের সর্বনিম্ম  পরিমান আকাশ ও যমীন, যার সর্ব উচ্চতার পরিমান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না’ [সূরা ইমরানের ১৩৩  এর অংশ] ‘জান্নাত দেখার পর জান্নাতিরা বুঝে যাবে জান্নাত কত বিশাল তার নেয়ামত কত অসংখ্য’ [সূরা দাহার ২০ এর অংশ] ‘জান্নাতের একশত স্তর আছে যার প্রত্যেকটা স্তর আকাশ ও যমীন সমপরিমান’। ‘জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ ব্যক্তিকে এই পৃথিবীর দশ পৃথিবী সমপরিমান জান্নাত দেওয়া হবে। [মুসলিম] জান্নাতের অট্টালিকা, প্লট, চিরুনী, এমনকি নিত্য-প্রয়োজনীয় সমস্ত আসবাব পত্র সোনা-চাঁদীর হবে। বিল্ডিং সমুহ চন্দন কাঠ দ্বারা সুসজ্জিত হবে, যা জঁকজঁক করে জ্বলতে থাকবে এবং তার থেকে সুঘ্রাণ বের হবে। ‘জান্নাতিদের চেহারা চাঁদের মতো জঁকজঁক করবে। [বুখারী] জান্নাতের একটি ইট লাল চাঁদী, আরেকটি সবুজ চাঁদীর, আরেকটি লাল স্বর্ণ, সাদা স্বর্ণ, লাল ইয়াকুত পাথর, সবুজ ইয়াকুত পাথর, সাদা মোতি, বিভিন্ন রং-বেরঙ্গের জমুররুদ পাথরের হবে। এবং তার সিমেন্ট হবে মেসকআম্বরের। তার কংকর  মোতি ও ইয়াকুত পাথরের। মাটি মিশকের, ঘাস গুলি জাফরানের, প্রত্যেক বিল্ডিংয়ে বড় বড় সুন্দর সাদা মোতির গুম্বুজ থাকবে। ‘প্রত্যেক বিল্ডিংয়ে ৬০ মাইল লম্বা তাবু থাকবে। সেখানে হুরেরা অবস্থান করবে। তারা তাদের স্বামীর আগমনে আপেক্ষমান থাকবে। [মুসলিম] প্রত্যেক জুমাবারে জান্নাতিরা জান্নাতের বাজারের (যেখানে কোন বেচাকিনা নেই) অডিটেরিয়ামে সমবেত হবে, সেখানে তারা সবাই একসাথে আল্লাহর সৌন্দর্য উপভোগ করবে। পৃথিবীর শুরু থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত যত নারী-পুরুষের সৌন্দর্য আছে; সব এক সাথে করলে একজন জান্নাতি হুরের সমপরিমান হবে না। আবার পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য ও জান্নাতের সমস্ত হুরদের সৌন্দর্য ও আল্লাহর গায়েবী খাজানার সৌন্দর্য এক সাথে করলে আল্লাহর সৌন্দর্য এর চাইতে কোটি কোটি গুণ বেশী হবে। সুতরাং দুনিয়া ও আখেরাতের সকল সৌন্দর্য হলো আল্লাহর সৌন্দর্যের বিজ্ঞাপণ। সুতরাং আমরা কিসের পিছনে দৌঁড়াচ্ছি।       (কিতাব তাজকিরা ঈমাম কুরতুবী রহ. ৪২০ পৃষ্ঠা )
দুনিয়ার প্রত্যেক মৌসুমি ফল জান্নাতে সবসময়ই থাকবে। জান্নাতে কোন কিছু পাওয়ার জন্য কোন অনুমতি লাগবে না, ইচ্ছা জাগার সাথে সাথে চোখের পলকের মধ্যেই এসে যাবে। জান্নাতে সর্বপ্রকার ফলের গাছ-গাছালি যা কাঁটাহীন লম্বা ঘণ ছায়াদার সবুজ শস্য-শ্যামল থাকবে, যার মূল-ডালগুলি লাল স্বর্ণের হবে। ‘তুবা’ জন্নাতের একটি বৃক্ষের নাম যার ছায়া শতবছরের রাস্তার সমান’। যাইতুন জান্নাতি গাছ’। খেজুর মটকা ও বালতির মতো মোটা ও বার হাত লম্বা হবে যা দুধ থেকেও সাদা, মধু থেকেও মিষ্টি, মাখন থেকেও নরম হবে। হুজুর সা. বলেন, ‘জান্নাতি ফলের শীষ এত বড় হবে যে, যদি তা পৃথিবীতে আসত; তাহলে তা সমস্ত সাহাবাগণ কিয়ামত পর্যন্ত খেয়ে শেষ করতে পারত না’। জান্নাতের কোন বৃক্ষ থেকে কোন ফল পড়লে সাথে সাথে সেখানে আরেক বৃক্ষ হয়ে যাবে। ‘দুনিয়ার ‘ সাইহান, জাইহান, ফোরাত, নীলনদ জান্নাতের নদী। [মুসলিম] হাউজে কাউসার আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল সা. কে দেওয়া উপহার যার উভয় তীর স্বর্ণ নির্মিত, প্লাটফর্ম হবে রোপা নির্মিত, তার মধ্যে থাকবে মোতি খচিত দুটি গুম্বজ, তার   কংকর সমূহ মোতি ও ইয়াকুতের, যার মাটি বা সুগন্ধি মিশক আম্বরের, যার মধ্যে থাকবে উটের গর্দানের ন্যায় প্রাণী যা খেয়ে জান্নাতিরা তৃপ্তি লাভ করবে। তার উপর উরন্ত পাখীর গোশত ভক্ষণ করে তৃপ্তি লাভ করবে। যার দুরত্ব মদীনা থেকে আম্মান পর্যন্ত।  যার পানীয় মধু থেকেও মিষ্টি, বরফ থেকেও সাদা, পনির থেকেও নরম, আকাশের তারকারাজির সমপরিমান তার সামনে থাকবে সোনা-চাঁদীর  পেয়ালা, রাসূল সা. নিজ হাতে তাঁর উম্মতকে সেখানে পানি পান করাবেন, যা পান করার পর আর কখনো মানুষ পিপাসার্ত হবে না। ‘জান্নাতিরা নিজেদের ইচ্ছামত জান্নাতের নদী থেকে তাদের অট্টালিকা পর্যন্ত ছোট ছোট সেমী-নদী বের করে নিতে পারবে। [তিরমিযী] ‘জান্নাতের একটি নদীর নাম ‘হায়াত’ যার মাধ্যমে জাহান্নামীদেরকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে আবার জান্নাতে দেওয়া হবে। [মুসলীম] ‘জান্নাতিদের প্রথম খাদ্য হবে তিমি মাছের কলিজা, পরবর্তী খাদ্য হবে গরুর গোশত’। জান্নাতিরা মোটা পাতলা সবুজ রেশম কাপড় পরিধান করবে, খাঁটি স্বর্ণ ও জওহারের অলংকার, খাঁটি মোতির অলংকার, মোতি মিশ্রিত স্বর্ণ ছাড়াও ‘সুন্দস’ ও ‘ইস্তাবরাক’ নামক রেশম বস্ত্র পরিধান করবে। [কিতাব আলমুত্বাজিরুর রাবিহ ঈমাম শারাফুদ্দিন দামিয়াতী ৪৯০ পৃষ্ঠা]
জান্নাতির পোশাক কখনো পুরাতন কিংবা ময়লা হবে না, পাল্টাতে চাইলে ইচ্ছা করার সাথে সাথে যেমন পোশাক চাইবে, যেমন রং চাইবে আল্লাহর গায়েবী খাজানা থেকে চলে আসবে। জান্নাতের রুপ লাবণ্যে অপূর্ব রমণীগণ একসাথে সত্তর জোড়া কাপড় পরিধান করতে পারবে, যা এত উন্নতমানের হবে যে, এর ভেতর দিয়ে শরীর দেখা যাবে। তাদের একটি উড়না দুনিয়ার সমস্ত সম্পত্তি থেকে বেশী দামী হবে। ‘দুনিয়াতে অজুর পানি যতটুকু যায় তত টুকুর মধ্যে স্বর্ণ-রোপ্য নির্মিত কংকন পড়বে। [মুসলিম] জান্নাতে নারী পুরুষ সবাই কংকন পড়ে সাঁজ-গোজ করতে পারবে। ‘তারা সেখানে উন্নত মানের রেশম রোমাল ব্যবহার করবে। [বোখারী] ‘জান্নাতিদের সম্মানে মাথায় একটি রাজ-মুকুট রাখা হবে’। ‘সর্ব প্রথম ৭২ জন হুরের সাথে তার বিয়ে হবে। {তিরমিযী] আল্লাহ বলেন, “হুরে আইনদের সাথে আমি তাদের বিয়ে পড়াব” সূরা তুর ২০। তাদের জন্য সেখানে মখমল ও নরম কার্পেট দ্বারা তৈরি খুব সুন্দর বিছানা ও মূল্যবান বালিশ ও রং-বেরঙ্গের হেলানদ্বার থাকবে তাদের বৈঠক খানায়। ‘ঘন ছায়াময় মসনদ স্থাপন করে স্বীয় স্ত্রীদের সামনে আনন্দময় আলাপচারীতায় মেতে উঠবে। [সূরা ইয়াসিনের ৫৫-৫৬ অংশ]  জান্নাতিদের সেবক-সেবিকা শৈশব বয়সী হবে। তারা সব সময় মোতির ন্যায় সুন্দর, মনপুত দৃশ্যমান ও চৌকশ হবে, চলতে ফিরতে মনে হবে যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা। ‘মুশরিকদের নাবালক বয়সে মৃত্যু বরণকারী বাচ্চারা জান্নাতিদের সেবক হবে, [আবু নাঈম ও আবু ঈয়ালার বর্ণনায়]  দুনিয়ার নারীরা জান্নাতের হুরদের লিডার হবে। তারা জান্নাতের হুরদের চাইতেও বেশী সুন্দরী হবে। হুরেরা তাদের স্বামীর সাথে মিলন হওয়ার পরেও তারা কুমারী থেকে যাবে। ‘জান্নাতি রমণীগণ একবার দুনিয়ার দিকে উঁকি মারলে (সূর্যের চেয়ে বেশী) পূর্ব-পশ্চিম আলোকিত হয়ে যাবে’।
‘জান্নাতি রমণীগণ এমন সুন্দরী হবে যে, তাদের শরীরের ভিতরের হাড্ডি মজ্জা বাহির থেকে দেখা যাবে। [তিরমিযী] ‘প্রথম যে দলটি জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের চেহারগুলো চৌদ্দ তারিখের চাঁদের ন্যায় উজ্জল হবে। [তিরমিযী] ‘যে মহিলার দুনিয়াতে একাধিক বিয়ে হয়েছে সে তার ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোন স্বামীকে গ্রহণ করতে পারবে। [তাবরানী] ‘জান্নাতরে হুর ‘ইন’ এতটা লজ্জাশীল হবে স্বীয় স্বামী ছাড়া অন্য কারো দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। হুরেরা ডিমের ভিতর লুকায়িত পাতলা চামড়ার চেয়েও অধিক নরম হবে “যেন তারা সুরক্ষিত (সাজানো) ডিম। [সূরা সাফ্ফাত ৪৯] তারা লাজুক চক্ষু বিশিষ্ট, মোতির ন্যায় সাদা সচ্ছতা ও রং এমন নিঁখুত হবে যে, মনে হবে যেন সংরক্ষিত অলংকার। জান্নাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি হবে সবচাইতে বড় সফলতা এরপর আল্লাহ আর কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না। জান্নাতে আল্লাহকে দেখা হবে জান্নাতিদের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। আল্লাহকে দেখার পর চেহারার সৌন্দর্য আরো বেড়ে যাবে। স্বচ্ছ আকাশে সূর্য দেখতে যেমন কোন সমস্যা হয় না, ১৪ তারিখের চাঁদ দেখতে যেমন কোন সমস্যা হয় না, ঠিক তেমনি আল্লাহকেও মানুষ দেখতে কোন সমস্যা হবে না। জান্নাতের মধ্যে কোন ঘুমের প্রয়োজন হবে না। ‘জান্নাতের মধ্যে দাঁড়ি- গোফ থাকবেনা। [তিরমিযী] ‘৩০-৩৩ বছরের যুবক থাকবে। ‘মুমিন ব্যক্তি জান্নাতে সন্তান কামনা করলে জান্নাতি রমণীদের সাথে সহবাসের পর মুহর্তের মধ্যেই গর্ভধারণ করে ব্যথা ছাড়া প্রসব করবে’ [ইবনে মাজা]
আল্লাহর রাসূল সা. জান্নাতের বর্ণনা করার সময় কিছু সাহাবী বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আনসারী সাহাবীগণ চাষাবাদ পছন্দ করে, সুতরাং জান্নাতে চাষাবাদ থাকবে ? হুজুর সা. হেসে ফেললেন আর বললেন, যদি কেউ কৃষি কাজ করতে আগ্রহবোধ করে তাহলে মুহর্তের মধ্যে বীজ বুনার সাথে সাথে বড় হয়ে ফল ধরে পেঁকে যাবে ক্লান্তি ছাড়া তা কাঁটবে, পাহাড় সমপরিমান ফলন হবে। [বোখারী] ‘আদম সন্তানের মধ্যে ৯৯৯ জন জাহান্নামে যাবে একজন জান্নাতে যাবে’। এই কথা শুনে সাহাবা কেরাম ভয় পেয়ে গেলেন, হুজুর সা. বললেন, ‘ইয়াজুজ মাজুজ থেকে ৯৯৯ জন তোমাদের থেকে একজন নেওয়া হবে। [মুসলিম] হযরত মূসা আ. আল্লাহকে বলেন, হায় আল্লাহ! তুমি মুমিন ব্যক্তিকে দুনিয়াতে অনেক পরীক্ষায় রাখ এবং কাফেরকে অনেক আনন্দে রাখ। আল্লাহ জান্নাত ও জাহান্নামের দারোয়ানকে বললেন, জান্নাতের ও জাহান্নামের পর্দা সরিয়ে দাও; মূসা জান্নাত ও জাহান্নাম দেখে নিক; যখন পর্দা সরে গেল তখন মুসা আ. আশ্চর্য হয়ে বললেন, হায় আল্লাহ! যদি একটি মানুষকে একহাজার বৎসর হায়াৎ দেওয়া হয়; এবং তার দু-হাত, দু-পা না থাকে; শরীরের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে চলে; এবং তাকে সাহায্য করার মতো কেউ না থাকে; এভাবে একহাজার বৎসর কষ্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর পর এমন জান্নাত পেলে সেও বলবে; আমি কখনো দুঃখ চোখে দেখিনি। অর্থাৎ জান্নাতের সুখ দেখে দুনিয়ার দুঃখের কথা ভুলে যাবে। আবার দুনিয়াতে একহাজার বৎসর হায়াত পেয়ে এত সুখি হয় যে, দুঃখ কখনো চোখে দেখিনি; সেও জাহান্নাম দেখলে বলবে; হায় আল্লাহ! আমি সুখ কোন দিন চোখে দেখিনি অর্থাৎ জাহান্নামের শাস্তি দেখে দুনিয়ার সুখের কথা এবং জান্নাতের সুখ দেখে দুনিয়ার দুঃখের কথা ভূলে যাবে। সুতরাং কত সুখ ও কত দুঃখ উপলব্ধি করুন। হযরত জিবরিল আ. যিনি ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ তেই সবসময় থাকেন; তিনিও জান্নাত দেখে ধোঁকায় পড়েছেন। আল্লাহ জিবরিল আ. কে জান্নাত দেখার জন্য ডাকলেন, তিনি জান্নাতে ডোকার পর হঠাৎ এক চাক-চিক্য আলো দেখতে পেয়ে সেজদায় পড়ে গেলেন। আল্লাহ ডাকলেন, হে জিবরিল! তুমি কাকে সেজদাহ করছ? জিবরিল আ. বললেন, হায় আল্লাহ! আমি আপনার আলো দেখতে পেয়েছি। আল্লাহ বলেন, সেজদা থেকে মাথা উঠাও; তিনি মাথা উঠিয়ে দেখেন, তার সামনে জান্নাতের একজন ‘হুর’ হাসছে তার দাঁতের ঝিকঝিকি ঝিকিমিকি এমন আলো ছড়িয়েছে যে, জিবরিল আ. ধোঁকায় পড়ে গেছেন। সুতরাং আল্লাহ আমাদের মনগুলিকে ক্ষণস্থায়ী চাক-চিক্যময় দুনিয়া থেকে গুড়িয়ে জান্নাতের সৌন্দর্য উপলব্ধি করার তওফিক দিন এবং আল্লাহ এই সীমিত পরিশ্রমটুকু কবূল করুন। এবং প্রত্যেকের আমল আখলাক সুন্দর করে দিন।

জাহান্নামের শাস্তি সমূহের বর্ণনা
জাহান্নাম: আগুনের তাপদাহ. প্রজ্জ্বলন, অগ্নীশিখা জাহান্নামের সাতটি দরজা, প্রত্যেক অপরাধী নিজ নিজ অপরাধ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দরজা দিয়ে প্রবেশ করার পর, মজবুত করে লাগিয়ে দেওয়া হবে। সাতটা জাহান্নামের নাম হলো- এক. জাহান্নাম  দুই. স্বায়ীর তিন. চাক্বার চার. হোতামা পাঁচ. লাজা ছয়. জাহীম সাত. হাবীয়া। মুনাফেক এবং যারা মানুষের আমানত খেয়ে ফেলে তারা হাবীয়া নামক জাহান্নামে প্রবেশ করবে। সত্য গ্রহণ করা থেকে বিমুখ ও বীতশ্রদ্ধ ব্যক্তির জন্য তৈরি করা হয়েছে আগুনের পোশাক, আগুনের বিছানা, আগুনের ছাওনী, আগুনের ছাতা, আগুনের বেড়ী, আগুনের জিঞ্জির, আগুনের লোহার হাতুড়ী, আগুনের গুর্জ, আগুনের উওপ্ত আসন, আগুনে জন্মগ্রহণ কারী উটের সমান বিষাক্ত সাপ; যা একবার ধ্বংসন করলে এক হাজার বৎসর তার অতিষ্ট-তীব্র ব্যথা উপলব্ধি করবে। আগুনের জন্মগ্রহণকারী খচ্চরের সমান বিষাক্ত বিচছু, আগুনের জন্মগ্রহণকারী কাঁটা বিশিষ্ট জাক্কুম বৃক্ষের ফল, পান করার জন্য রয়েছে উত্তপ্ত পানি, দুর্গন্ধময় পুঁজ। মৃত্যুর লৌহপাঞ্জা যখন মানুষকে ধরবে, প্রাণ যখন কন্ঠাগত হবে স্মরণ কর সে সময়ের কথা। আল্লাহ বলেন, “দেখ এই হল ঐ জাহানাœম যাকে তোমরা অস্বীকার করতে। [সূরা তূর ১৪ আয়াত] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, “সুতরাং যারা অবিশ্বাস করে, তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক; তাদের মাথার উপর ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত টগবগ করা পানি; যার ফলে তাদের উদরে যা আছে (নাড়ী-ভুঁড়ী, কলিজা ও গুর্দা) তাদের চর্ম বিগলিত হবে; আর তাদের জন্য থাকবে লৌহনির্মিত হাতুড়ীসমূহ। [সূরা হজ্জ্ব ১৯.২০.২১] অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে “সেদিন দুর্ভোগ হবে মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের” [সূরা মুরসালাত ১৫] “জাহান্নাম দেখামাত্র অপরাধীদের চেহারা কালো হয়ে যাবে। [সূরা ইউনূস ২৭] “পাপীদেরকে উপুড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। [সূরা কামার ৪৮]  “জাহান্নামীরা আগুন ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটাছুটি করবে (ক্লান্তি, ক্ষুধা ও পিপাসায়) [সূরা রাহমান ৪৪] আর দুনিয়াতে উলঙ্গ হয়ে সমুদ্রসৈকত, সুইমিং পুলে ছুটাছুটি করে  “(জাহান্নামীকে) অতি গরম বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে; কালো বর্ণের ধোঁয়ার ছায়ায় রেখে শাস্তি দেওয়া হবে। [সূরা ওয়াক্বেয়া ৪২.৪৩] ‘(দুনিয়ার ক্রীড়া-কৌতুকে মগ্ন থাকা মানুষ) যখন তারা তা (জাহান্নাম) দেখবে তখন দূর থেকে তার ক্রুদ্ধ গর্জন ও ভয়ংকর চিৎকার শুনতে পাবে। [সূরা ফুরকান- ১২] অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে জাহান্নাম ক্রোধে, রোষে উদ্বেলিত হয়ে ফেটে পড়বে। অবাধ্যকারী শাস্তিতে অস্থির হয়ে মৃত্যু কামনা করবে; কিন্তু মৃত্যু হবে না। জাহান্নামের আগুণ তাদের চেহারা বিদগ্ধ করবে এবং তাদের জিহ্বা বের হয়ে আসবে। তারা সেখানে নিদারুণ দৈন্যাবস্থায় কালাতিপাত করবে। ‘জাহন্নামীরা সেখানে মরবেও না বাঁচবেও না। [সূরা আ’লা ১৩] ‘(জাহান্নামের) আগুন আত্মাকে গ্রাস করবে। [সূরা হুমাজা ৭] আগুন তাদেরকে চতুর্দিক থেকে পরিবেষ্টন করে রাখবে। কুরআন বলে “তোমাদের উভয়ের প্রতি (মানুষ আর জ্বীন) প্রেরিত হবে অগ্নীশিখা ও ধুম্রপুঞ্জ (গলিত তামা) তখন তোমরা তা প্রতিরোধ করতে পারবে না। [সূরা রাহমান ৩৫] আজকাল গ্যাস ওয়েল্ডিং দিয়ে লোহা কিংবা তামা ওয়েল্ডিং করা হয় একটা আরেকটাকে মজবুত ভাবে ধরার জন্য, সেভাবে অপরাধীদের ওয়েল্ডিং করা হবে। দোযখের শাস্তির কঠিনতা ও ভয়াবহতা দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বাইরে বের হয়ে আসতে চাইবে, তখন দোযখের ফেরেস্তাগণ পুনরায় মিথ্যাজ্ঞানকারীদের দোযখের গভীরতায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে।
জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুন থেকে সত্তর গুণ বেশী উত্তপ্ত হবে। জাহান্নামকে ‘বিরাট অগ্নী কুন্ডলী’ আল্লাহর ‘প্রজ্জলিত অগ্নী’  ‘লেলিহান অগ্নী শিখা’ ‘জলন্ত আগুন’ সহ বিভিন্ন নামে নামকরন করা হয়েছে। জাহান্নামের আগুন দুনিয়া থেকে কয়েক দশক গুণ বেশী হবে। (সত্য পরিত্যাগীকে) “পুঁজমিশ্রিত পানি পান করানো হবে; যা সে অতি কষ্টে এক ঢোক এক ঢোক করে গিলতে থাকবে; এমনকি তা গিলাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে; (এক হাজার বৎসর পানির পিপাসায় কাতরানোর পর পুঁজমিশ্রিত অতীব গরম ফুটন্ত পানি দেওয়া হবে।) চতুর্দিক থেকে তাকে বেষ্টন করবে মৃত্যু যন্ত্রনা, কিন্তু তার মৃত্যু হবে না এবং তার পরেও থাকবে (এর চাইতেও) কঠোর শাস্তি। [সূরা ইবরাহিম ১৭.১৮] জাহান্নামী বিষাক্ত দুরগন্ধময় খাবার উওপ্ত গরম পানি দুরগন্ধময় রক্ত বমি যাকে কুরআনের ভাষায় ‘মা’য়ে সাদীদ’ বলে দেওয়া হবে। মাথায় উওপ্ত পানি ঢেলে দেওয়া হবে। ফুটন্ত পানি পান করানো হবে। শরীর থেকে র্নিগত ঘাম ও বমি মিশ্রিত খাবার দেওয়া হবে। পাপীদের চোখ কালো ও নীলবর্ণের হবে, তারা সর্বদা আতঙ্কগ্রস্ত হবে। পাপীদেরকে মাথার চুলের অগ্রভাগ ও পায়ের মধ্যে ধরে ঝুলন্ত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। চল্লিশ হাজার বৎসর পর তার তলায় পৌঁছবে।[ইবনে আবিদ দুনিয়া জাহান্নামের বর্ণনা কিতাব]
জাহীম নামক জাহান্নামের অধিবাসীরা ভয়ংকর মোটা আকৃতি নিয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সা. এরশাদ করেন, ‘দোযখে কাফেরের এক কাঁধ থেকে অপর কাধ পর্যন্ত দ্রুত ভ্রমন কারীর তিন দিন সমপরিমান দূরত্ব হবে। [মুসলীম শরীফ] হুজুর সা. আরও বলেন, ‘কাফেরের চোয়ালের দাঁত এক একটি উহুদ পাহাড় সম পরিমান, আর তার চামড়া ঘনত্ব তিন দিনের সমপরিমান দূরত্ব। [মুসলিম তিরমিজ শরীফ] অন্যত্র হুজুর সা. বলেন, ‘কাফেরের চামড়ার পুরত্ব বিয়াল্লিশ হাত মোটা হবে, তার বাহু ‘বাইজা’ পাহাড়ের মতো, রান হবে ‘ওরকান’ পাহড়ের মতো। তাকে যে স্থানে শাস্তি দেওয়া হবে তার দূরত্ব মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত। [তিরমিজী শরীফ] অন্যত্র আরো বলেন, ‘কাফেরের চামড়া হবে সত্তর হাত মোটা, তার বসার স্থান হবে আগুনের এবং বিশাল জাহান্নামের একটি কর্ণার দখল করে রাখবে’। দুনিয়ার অহংকারী (ধনাঢ্য, সুন্দর, সুন্দরী, শিক্ষিত ও ক্ষমতাধর) ব্যক্তিকে পিপীলিকার ন্যায় তুচ্ছ শরীর দিয়ে তাদের শক্তি ও দম্ভকে চুর্ণ করে লাঞ্চিত অপমানিত করা হবে। তাদের চেহারা কালো, কুৎসিত-বিশ্রী, ফ্যাকাসে, দুঃখ-দুশ্চিন্তায় কালো ও দীপ্তিহীন হবে। জাহান্নামের হালকা শাস্তি হবে পায়ে আগুনের জুতা পরানো হবে, যার ফলে তার মস্তিষ্ক বিগলিত হতে থাকবে, ভাতের মার যেভাবে বিগলিত হয়।
অনুকম্পাশীল ও প্রকৃতদাতা আল্লাহ বলেন, নিশ্চই জাক্কুম গাছ হবে পাপীদের (যারা দুনিয়াকে অস্থায়ী, ধ্বংসশীল ও পরীক্ষাগার ভেবে প্রস্তুত হয় না তাদের) খাদ্য যা গলিত তামার মত পেটের ভেতর ফুটতে থাকবে, যা উত্তপ্ত গরম পানির মত। বলা হবে “তাকে ধর এবং টেনে নিয়ে জাহান্নামের মধ্যস্থলে নিক্ষেপ কর, মাথায় গরম ফুটন্ত পানি ঢেলে দাও।  [সূরা দুখানের ৪৪-৪৮ পর্যন্ত] পাপী ব্যক্তি জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে কয়লার ন্যায় হয়ে যাবে। জাহান্নামে পাপীষ্টদের এক কাঁধ থেকে আরেক কাঁধ পর্যন্ত দ্রুতগামী অশ্বারোহীর তিন দিন চলার পথ সমপরিমান হবে। কোন রেওয়াতে কাফেরের কান থেকে কাঁধ পর্যন্ত সত্তর বৎসরের রাস্তা, তাদের শরীর থেকে লালা, রক্ত ও ক্বফ প্রবাহিত হবে প্রতিবন্দীদের মতো। আল্লাহ বলেন, “যারা আমার নিদর্শন সমূহকে অস্বীকার করবে আমি তাদের আগুনে নিক্ষেপ করব, তাদের চামড়াগুলি যখন জ্বলে পুড়ে যাবে, তখন আবার নতুন চামড়া পাল্টে দিব, যাতে তারা আগুনের আযাব আস্বাদন করতে থাকে, নিশ্চই আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, হেকমতের অধিকারী। [সূরা নিসা ৫৬] জাহান্নামের কল্পনা যার মাথায় থাকে, কিংবা জান্নাতের আশা যার অন্তরে থাকে সে কখনোই আরামে ঘুমোতে পারে না। আয়েশা রা. বর্ণিত রাসূল সা. বলেন, ‘জাহান্নামের শ্বাস নেওয়া বাষ্পের কারনে পৃথিবীতে জ্বর হয়ে থাকে অতএব তাকে পানি দিয়ে ঠান্ডা কর। [বুখারী] আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হুজুর সা. বলেন, তোমরা গরমের সময় যে তীব্র গরম উপলব্ধি কর এবং ঠান্ডার সময় যে তীব্র ঠান্ডা অনুভব কর তা জাহান্নামের শ্বাস গ্রহণের কারণে হয়ে থাকে। কারন জাহান্নাম আল্লাহর কাছে অভিযোগ করেছিল যে, হায় আল্লাহ! আমার গরমের তীব্রতায় এক অংশ অন্য অংশকে খেয়ে ফেলছে তখন আল্লাহ তাকে বৎসরে দুই বার শ্বাস গ্রহণের অনুমতি দেন। [বোখারী]
জাহান্নামের অগ্নীকুন্ড যখনই ঠান্ডা হয়ে যাবে তখনই নির্দয় পাহারাদার (দারোগারা) তা আরো উত্তপ্ত করে দিবে, “যখনই তা নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হবে, তখনই তার আগুন আরো বৃদ্ধি করে দিব। [সূরা বনী ঈসরাইল ৯৭] “কখনোই না সে (মানুষ) অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে পিষ্ট কারীর মধ্যে, আপনি কি জানেন পিষ্টকারী কী? এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত অগ্নী, যা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছবে, এতে তাদের বেঁধে দেওয়া হবে, লম্বা লম্বা খুঁটিতে। [সূরা হুমাযা ৪-৯] “তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে। [সূরা গাসিয়া ৪] “(হে মানুষ) তোমরা জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচার চেষ্টা কর, যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর যা প্রস্তুত করা হয়েছে অস্বীকার কারীদের জন্য। [সূরা বাক্বারা ২৪] আবু যর রা. থেকে বর্ণিত, হুজুর বলেন, ‘মানুষ যদি জাহান্নাম দেখতো তাহলে হাসা ভুলে যেত, ভয়ে স্ত্রী সহবাসের চাহিদা হারিয়ে ফেলত, শহরের আরামদায়ক জীবন পরিত্যাগ করে জঙ্গলে গিয়ে সর্বদা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতো’। রাসূল সা. আরো বলেন, আমি নবী আমি যা দেখি তোমরা তা দেখ না, আমি যা শুনি তোমরা তা শুনো না, নিশ্চই আকাশ আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছে (জাহান্নামের ভয়েতে) আর তার তাই করা উচিত, কারণ আকাশের মধ্যে এমন এক বিঘত জায়গা খালি নেই, যেখানে কোননা কোন ফেরেস্তা সেজদায় পড়ে নেই’ (আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করছে না) [ইবনে মাজা] অথচ মানুষ নিশ্চিন্তে শুধু টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ীর ধ্যানে লিপ্ত। ফেরেস্তাদের কোন জান্নাত জাহান্নাম নেই তারপরও তারা এত ভীত-সন্ত্রস্ত।
জাহান্নামের অগ্নীস্ফুলিঙ্গ অপরাধীর শরীরের মাংশ হাড্ডী থেকে আলাদা করে দিবে, “আগুণ তাদের মুখ-মন্ডল দগ্ধ করবে, তাতে তারা বীভৎস আকার ধারণ করবে। [সূরা মূমিন ১০৪] “কখনো নয় নিশ্চই তার লেলীহান অগ্নী চামড়া তুলে দিবে। [সূরা মায়ারিজ ১৫Ñ১৬] জাহান্নামের আগুণ মানুষকে জীবিত থাকতে দিবে না, মরতেও দিবে না। “আপনি কি জানেন অগ্নী কি? এটা অক্ষত রাখবে না, ছাড়বেও না, মানুষকে দগ্ধ করবে। [সূরা মুদ্দাসসির ২৭-২৯] জাহান্নামের একটা সাধারণ অগ্নী-স্ফুলিঙ্গ অট্টালিকা সমপরিমান হবে, “চল তোমরা তিন কুন্ডলী বিশিষ্ট ছায়ার দিকে, যে ছায়া সুনীবিড় নয় এবং অগ্নী উত্তাপ থেকে রক্ষা করে না, এটা অট্টালিকা সদৃশ বৃহৎ স্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করবে, যেন সে পীত  বর্ণের উষ্ট। [সূরা মুরসালাত ৩০-৩৩] দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ধনীরা যারা দুঃখ-কষ্ট কখনো চোখে দেখেনি, তারা এক পলক জাহান্নামের আগুন দেখে দুনিয়ার সুখের কথা ভুলে যাবে। জাহান্নাম দেখে নবীরা পর্যন্ত আত্মরক্ষার আবেদন করবে। যদি কারো কাছে সত্তর জন নবীর আমল সমপরিমান সওয়াবও থাকে সেও চিৎকার করতে থাকবে, বাঁচাও বাঁচাও বলে (ইয়া রাব্বি নাফসি, ইয়া রাব্বি নাফসি)। জাহান্নামীর শাস্তি এক পলকের জন্যও লাঘব করা হবে না। অসহ্য হয়ে মৃত্যুকে ডাকবে। আল্লাহ বলেন, ‘আজ তোমরা এক মৃত্যুকে নয়, হাজার মৃত্যুকে ডাক কিন্তু মৃত্যু আসবে না’। জাহান্নামের আগুন দেখা মাত্রই অপরাধীর চেহারা কালো হয়ে যাবে। জাহান্নামে নিক্ষেপ করার সময় তার থেকে উৎক্ষিপ্ত গর্জন শুনতে পাবে। ক্রোধে-গোস্বায় সে ফেটে পড়বে। “(জাহান্নামীরা) তথায় শতাব্দীর পর শতাব্দী অবস্থান করবে। [সূরা না’বা ৭-৮] জাহান্নামের দারোয়ান অত্যন্ত রুঢ়, নির্দয়, কুশ্রী আকৃতি ও কঠোর স্বভাবের হবে জাহান্নাম দূর থেকে তার অধিবাসীকে দেখে রাগে-ক্রোধে এমন চিৎকার ও হুঙ্কার করবে, যা শুনে কুফরী, বাতিলপন্থী ও অংশীবাদীরা অজ্ঞান হয়ে পড়বে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
হাশরের ময়দানে জাহান্নামকে টেনে আনতে চারশত নব্বই কোটি ফেরেশতা লাগবে। একেক ফেরেশতা যাদের কাঁধ থেকে কানের লতি পর্যন্ত পাঁচশত বৎসরের পথ। তাদের একটি আঙ্গুলে যদি সাত সমুদ্রের পানি রাখা হয়, তাহলে একফোটা পানিও নিচে পড়বে না। কী বিশাল বিশাল ফেরেশতা সুতরাং জাহান্নাম কত বড় অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলুন। জাহান্নামে একটি পাথর নিক্ষেপ করলে, তা তার তলদেশে পৌঁছতে ৭০ বৎসর সময় লাগবে। তার প্রশস্ততা আকাশ-যমীনের দুরত্বের চেয়েও বেশী। বৈজ্ঞানিকেরা বলছে মহাশূন্যের একটি গ্যালাক্সী থেকে আরেকটা গ্যালাক্সী এক লক্ষ বৎসরের পথ, আলোর গতি সমপরিমান (একলক্ষ ছিয়াসি হাজার মাইল প্রতি সেকেন্ডে) কোন যান দিয়ে ভ্রমন করলে। একেকটি গ্যালাক্সীতে বিশ হাজার কোটি ত্রিশ হাজার কোটি নক্ষত্র বাস করে। একেকটা নক্ষত্র আমাদের সূর্য নামক নক্ষত্র থেকেও বড়। বর্তমান বিজ্ঞানের আবিষ্কার অনুযায়ী যদি আল্লাহ একজন সাধারণ মুসলমানকে এই পৃথিবীর দশ পৃথিবী সমপরিমান জান্নাত দেন, তাহলে আদম আ. থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ এসেছে ও আসবে, তারা সবাই আল্লাহর একটি গ্যালাক্সীও দখল করতে পারবে না, অথচ মহাশূন্যের একশত ভাগের তিন ভাগের মধ্যে একশত কোটি গ্যালাক্সী বাস করে, আরো শাতানব্বই ভাগে কি আছে আল্লাহ ছাড়া কেউ বলতে পারে না। বর্তমান পযুক্তি সেই পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে কিনা আদৌ কেউ বলতে পারে না। ১৯৩৫ সালে ভারতীয় বৈজ্ঞানিক ‘সুব্রামানিয়াম চন্দ্র শেখর’ ইংল্যান্ডের এক বিজ্ঞান সভায় দৃঢ়ভাবে যুক্তি তুলে ধরেন ‘ব্যাকহোল’ এর পক্ষে ১৯৭০ সালে অংঃৎড়হড়সরপধষংধঃবষষরঃব ‘ব্যাকহোল’ আবিষ্কৃত হয়। প্রতিটা গ্যালাক্সীতে একটি ‘ব্যাকহোল’ আছে, যা চকলেটের মতো নক্ষত্র গুলোকে চুসে নিঃশেষ করে দেয়, তার শপথ আল্লাহ করছেন। তিনি বলেন, “আমি শপথ করছি নক্ষত্র রাজির অস্তাচলের, অবশ্যই এটা এক মহা শপথ, যদি তোমরা জানতে। [সূরা ওয়াকেয়া ৭৫-৭৬] অর্থাৎ ‘ব্যাকহোলের’ প্রচন্ড গতি প্রতিটি গ্যালাক্সীর নক্ষত্র, গ্রহ, কোয়াসার, নেবুলা, উল্কা, ধূমকেতুকে কিভাবে নিষ্পেষিত করছে, যদি তোমরা জানতে? আল্লাহ বলেন, “হে মানব জাতি! কোন জিনিষ তোমাকে তোমার মহিমাময় প্রতিপালকের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলে দিল? [সূরা ইনফিতার ৬] যে দুনিয়াকে আল্লাহ একটি মাছির সমপরিমান দামও দেন না, সেই দুনিয়ার বিশালত্ব দেখে হয়রাণ বৈজ্ঞানিকেরা। অথচ মানুষ একটি অট্টালিকা, একটি সুন্দরী স্ত্রী, ইন্ডাষ্ট্রি ও ভাল চাকুরী পেয়ে আল্লাহকে ভুলে যায়, নাউয়ুজুবিল্লাহ।
একদিন এই পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে, বার্ষিক গতি, আহ্নিক গতি স্তব্ধ হয়ে যাবে, আকাশ প্রলয়ংকারী ঝটিকার ন্যায় ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে একটার উপর আরেকটা আঁছড়ে পড়বে, পর্বতসমূহকে চালিত করা হবে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকনার মতো। পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে মহা প্রলয়ের প্রথম শিংগাধ্বনিতে। সূর্য যে একদিন আলো হারিয়ে ফেলবে, সে ব্যাপারে বর্তমান বিজ্ঞানও একমত। কিন্তু পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিলে সব মুসলমান হয়ে যাবে, সেজন্য ব্যাখ্যা দিতে নারাজ। জাহান্নামের দুটি বাউন্ডারীর মধ্যে দুরত্ব ৪০ বৎসরের রাস্তা। অপরাধীরা জাহান্নামে কান্না-কাটি করে এত অশ্র“ ঝড়াবে যে, যদি সেখানে নৌকা চালানো হয়, তাহলে তা চলবে, চোখের পানি শেষ হয়ে রক্ত আসতে থাকবে। [হাকেম] জাহান্নামীকে সেখানে চার ধরণের খাবার দেওয়া হবে এক. যাক্কুম  দুই. দারীঅ তিন. গিসলিন চার. জা’গুস্বা (অর্থাৎ কাঁটাযুক্ত খাবার)। দুর্গন্ধময় তিক্ত, কাঁটাযুক্ত খাবার জাহান্নামীকে দেওয়া  হবে, যা দোযখের তলদেশ থেকে উৎপন্ন হবে। যার মুকুল সমূহ বিষাক্ত সাপের ন্যায়। তাকে দেখতে মনে হবে যেন শয়তানের মাথা। তারা তা ভক্ষণ করবে ক্ষুধার তাড়নায় উদর পূর্ণ করে খাবে। তারপর থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ, তাদের গন্তব্য হবে প্রজ্জ্বলিত অগ্নীর দিকে তারা তাদের বিপদগামী পিতৃ পুরুষদেরকে অন্ধ অনুসরণ করার কারণে। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চই যাক্কুম বৃক্ষ হবে পাপীদের খাদ্য, গলিত তামার মতো তা তার উদরে ফুটতে থাকবে ফুটন্ত পানির মতো। [সূরা দুখান ৪৩-৪৬] জাহান্নামীদের খাবার এত বিষাক্ত হবে যে, যদি তার এক ফোটা পৃথিবীতে ছড়ানো হয় তাহলে সমস্থ পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
অপরাধ করে যারা অধরা থাকার চিন্তা করে তাদের পাঁচ ধরণের পানি পান করানো হবে এক. ‘মাউন হামীম’ (ফুটন্ত গরম পানি) দুই. ‘মাউস সাদীদ’ (ক্ষতস্থান থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত) তিন. ‘মাউল মুহল’ (তৈলাক্ত টগবগ করা পানি) চার. ‘গাস্বাক্ব’ (কালো দুর্গন্ধময় পানি) পাঁচ. ‘তিনাতুল খাবাল’ (জাহান্নামীদের ঘাম) আল্লাহ বলেন, “তাদেরকে পান করানো গলিত পুঁজ যা অতি কষ্টে (একঢোক  একঢোক করে) গিলবে এবং (বিষাক্ত দুর্গন্ধে) তা গলধঃকরণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে, তাকে গ্রাস করবে মৃত্যু যন্ত্রণা, কিন্তু তার মৃত্যু হবে না। আরো পশ্চাদে থাকবে কঠোর শা¯ি। [সূরা ইবরাহিম ১৬-১৭] তৈলাক্ত ফুটন্ত গাঢ় দুগন্ধময় গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয়র বাষ্প তাদের মুখমন্ডলকে বিদগ্ধ করবে, এটা কতই না নিকৃষ্ট পানি নিকৃষ্ট আশ্রয়। দু্িনয়াতে নেশা গ্রস্থ ও মদ পানকারীকে জাহান্নামীদের গাঢ় বিষাক্ত ঘাম দেওয়া হবে। “ফুটন্ত পানি ও প্রবাহিত পুঁজ, এটাই সমুচিত প্রতিফল। [সূরা নাবা ২৫] আল্লাহর ১০১ টা নামের মধ্যে সবগুলোই রহমত ও বরকতময় কিন্তু একটি নাম বিপদের অশনিসংকেত বহণ করে সেটা হলো ‘মুনতাক্বিম’ অর্থাৎ প্রতিশোধ গ্রহণকারী। তিনি বলেন, “নিশ্চই আমি অপরাধীদের থেকে প্রতিশোধ নিব। [সূরা সাজদাহ ২২]
“জাহান্নামীরা জান্নাত বাসীকে ডেকে বলবে আমাদের উপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা তোমাদের প্রতি আল্লাহ প্রদত্ত জীবিকা থেকে কিছু প্রদান কর, তারা বলবে, আল্লাহ এসব খাবার কাফেরদের জন্য হারাম করেছেন। [সূরা আরাফ ৫০] পাপীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় জাহান্নামের দিকে হাকিয়ে নেওয়া হবে। [সূরা মারয়াম ৮৬] অসহ্য পিপাসার কারণে উত্তপ্ত পানির চতুর্দিকে ঘোড়পাক খেতে থাকবে। “এটাই জাহান্নাম যা অপরাধীরা অবিশ্বাস করত, তারা তার অগ্নী ও ফুটন্ত পানির মধ্যে ছুটা-ছুটি করতে থাকবে। [সূরা রাহমান ৪৩] যাক্কুম খাওয়ার পর জাহান্নামীরা তৃষ্ণার্ত উটের ন্যায় তীব্র পিপাসা অনুভব করবে। “উত্তপ্ত পানি মাথায় ঢেলে দেওয়া হবে, অপরাধীদের চামড়া, চর্বি, পেটের ভিতরের নাড়ী- ভূঁড়ি, কলিজা ও গুর্দা সব জ্বলে যাবে। আল্লাহ বলেন, যারা কুফরী করে তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আগুনের পোশাক, তাদের মাথায় ঢেলে দেওয়া হবে ফুটন্ত পানি, যা তাদের উদরে যা আছে ও চর্বি বিগলিত করে দিবে। [সূরা হজ্জ্ব ২০] জাহান্নামীকে শৃংখলিত করে আলকাতরার পোশাক পড়ানো হবে। পাঁচড়া সৃষ্টিকারী জামা পড়ানো হবে। তাদের বিছানাও হবে আগুণের তৈরি। তাদের গালিচাও হবে আগুনের। তাদের চাদর হবে আগুণের। তাদের ছাতি বেষ্টনী হবে আগুণের। বেড়ী পড়িয়ে একশত পাঁচ ফিট লম্বা শিকল দিয়ে শৃংখলিত করা হবে, “বলা হবে তাদের গলদেশে বেড়ী পড়িয়ে দাও, অতঃপর নিক্ষেপ কর জাহান্নামে। পুনরায় তাকে শৃংখলিত কর সত্তর হাত দীর্ঘ শৃখলে, কারন সে আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না, অভাব গ্রস্থকে অন্য দানে উৎসাহিত করত না। [সূরা হাক্কাহ ৩৩-৩৪] ফেরেস্থাগণ তাদের জিঞ্জিরাবদ্ধ করে হাতে পায়ে বেড়ী পড়িয়ে আলকাতরার পোশাক পড়িয়ে টেনে নিয়ে যাবে। বিষাক্ত গরম হাওয়া কালো ধোঁয়ার মাধ্যমে শা¯ি,— প্রচন্ড ঠান্ডার মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে, যাকে ‘যামহারীর’ বলে কুরআনের ভাষায়। জাহান্নামে তাদেরকে অপমানিত লাঞ্চিত করা হবে, সমস্ত মানুষের সামনে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবে না। মৃত্যু কামনা করবে। গাধার ন্যায় উঁচু আওয়াজে কান্না করবে।
অপরাধীদের মস্তকের সম্মুখভাগের কেশ গুচ্ছ ধরে হেঁচড়িয়ে উপুড় করে ধুলিময় কালো চেহারা নিয়ে গভীর অন্ধকার জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা থাকবে অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায় হাত মাথার উপর দিয়ে বাঁধা হবে। পা ছাড়া শরীরের উপর হামাগুড়ি দিয়ে চলবে। এবং তাদের “আগুনের পাহাড়ে চড়ানো হবে। [সূরা মুদ্দাস্বির ১৭] ‘সউদ’ জাহান্নামের একটি পাহাড়ের নাম, তাতে আরহন করতে সত্তর বৎসর সময় লাগবে। আগুণের খুঁটিতে বেঁধে লোহার হাতুড়ী ও গুর্জের মাধ্যমে আঘাত করা হবে, সেই আঘাত খেয়ে যন্ত্রণাকাতর হয়ে জাহান্নাম থেকে বের  হতে চাইলে, পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সাপ বিচ্ছুর দংশনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে। যাকাত আদায় না করলে বিষাক্ত সাপ দিয়ে গলার মালা আকারে পড়িয়ে দেওয়া হবে, একেকটি বিচ্ছুর দাঁত খেঁজুরের কাঁটার মতো লম্বা হবে। রোজা ভঙ্গকারীকে উপুর করে লটকিয়ে রাখা হবে। যিনা কারী পুরুষদের লিঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হবে। নারীর লজ্বাস্থানে লোহা গরম করে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হবে। স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্য শিশুকে দুধ পান করানো নারীর স্তনে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হবে। এমন সহজ পাপের জন্য এত কঠিন শাস্তি , অথচ এর চাইতে কত কঠিন কাজ মানুষ বর্তমানে করে সুতরাং সেগুলো জন্য কী হতে পারে চিন্তা করুন।
কুরআন হাদীসের ইলম গোপনকারীকে জাহান্নামের আগুনের লাগাম পরানো হবে। যেসব নারী-পুরুষ সোনা-রোপা, ধন-সম্পত্তির যাকাত আদায় করে না, তাদের সেই সম্পত্তি দিয়ে আগুনের পাত তৈরি করা হবে, সেগুলো  উত্তপ্ত করা হবে। ছেঁকে ছেঁকে তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। জাহান্নামের একদিন পঞ্চাশ হাজার বৎসরের সমান হবে।  হুজুর সা. কে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহ রাসূল! যারা উটের হক আদায় করে না, তাদের অবস্থা কি হবে? হুজুর সা. বলেন, ‘তাদের একটি সমতল ভূমিতে উপুড় করে শুইয়ে তাদের সেই উটগুলোকে তাদের উপড় ছেড়ে দেওয়া হবে, সেগুলো তাদেরকে খুঁর দিয়ে মাড়াই করবে এবং মুখ দিয়ে কাঁমড়াতে থাকবে।  দ্বি-মুখীপনা লোকদের কিয়ামতের দিন আগুনের দুটি মুখ থাকবে। মিথ্যা প্রচারকারী লোককে তার জিহ্বা, নাক ও চোখ গর্দান পর্যন্ত বিদীর্ণ করা হবে। যিনাকারী নারী-পুরুষকে উলঙ্গ করে আগুনের তন্নুরে জ্বালিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে। সুদ খোরদের রক্তের নদীতে ছেড়ে দেওয়া হবে। অন্য হাদীসে ‘তাদের পেট একটি ঘরের সমান করে সেখানে জাহান্নামের সাপ-বিচ্ছু ছেড়ে দেওয়া হবে’। মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চস্বরে কান্না করা নারী-পুরুষকে কিয়ামত পর্যন্ত গন্দকের পাজামা পরিয়ে রাখা হবে, তাতে তাদের শরীরে এলার্জি সৃষ্টি হবে কুরআন মুখস্থ করে ভুলে গেলে কিংবা ইশার নামাজ আদায় না করে ঘুমিয়ে গেলে, সার্বক্ষণিকভাবে মাথা দলিত করা হবে। আত্মহত্যাকারী যেভাবে আত্মহত্যা করে সেভাবেই সার্বক্ষণিক শাস্তি দেওয়া হবে। লোক দেখানো ইবাদতকারী উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। গীবত কারী জাহান্নামে নিজের নখ দিয়ে স্বীয় চেহারা ও বুকের গোশত টেনে-ছিড়ে খাবে।
আল্লাহ বলেন, “পরিশেষে যখন ওরা জাহান্নামের সন্নিকটে পৌঁছবে, তখন কান, চোখ ও দেহের চামড়া তাদের কৃত কর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দেবে, তারা তাদের চামড়াকে (আশ্চর্য) হয়ে জিজ্ঞাসা করবে, তুমি কেন আমার বিরোদ্ধে সাক্ষ্য দিলে? উত্তরে চামড়া বলবে, আল্লাহ যিনি সমস্ত কিছুকে বাকশক্তি দিয়েছেন, তিনি আমাদেরকেও কথা বলার শক্তি দিয়েছেন। [সূরা ফুস্বিলাত ২০.২১] “জাহান্নামীরা (অসহ্য হয়ে) তার প্রহরীদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতিপালককে বল, যেন একদিনের জন্য আমাদের শাস্তি একটু লাঘব করে, (প্রহরীরা) বলবে, তোমাদের কাছে কি স্পষ্ট নিদের্শনাবলী নিয়ে কোন নবী রাসূল আসেনি? তারা বলবে, অবশ্যই এসেছিল, তারা বলবে সুতরাং তোমরা প্রার্থনা কর, কিন্তু সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের প্রার্থনা কোন কাজে দিবে না। [সূরা মুমিন ৪৯.৫০] এভাবে হাজার হাজার কুরআন হাদীস মানুষকে জাহান্নাম সম্পর্কে সতর্ক করছে। কিন্তু আমরা বেখবর হয়ে দুনিয়ার দিকেই দৌঁড়াচ্ছি। কিন্তু হঠাৎ যখন আজরাইল আ. এসে লাল কার্ড দেখাবেন, তখন স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে ও পরিবার-পরিজন থেকে বিদায় নেওয়ার সময়টুকু পাওয়া যাবে না। রোগ-ব্যাধি, বালা-মসীবত হলো হলুদ কার্ড সতর্ক হওয়ার জন্য। সুতরাং আল্লাহ আমাদের দুনিয়ার ভালবাসার ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলুন। আমীন ।
লেখক: কলামিস্ট, ইসলামি চিন্তাবিধ, ইমাম, জামে মসজিদ, সউদি আরব।

Print Friendly, PDF & Email

2,020 thoughts on “জান্নাতের নেয়ামতরাজি ও তার বর্ণনা :